Tuesday, 29 October 2013

পুংপুজো




সতীদাহ বন্ধ হয়েছে, কিন্তু   নারীবিরোধী অনেক প্রথাই বেশ বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে এই ভারতীয় উপমহাদেশে। এসব দূর করার কোনও উদ্যোগ তো নেওয়া হচ্ছেই না, বরং আরও ঘটা করে  পালন করার ব্যবস্থা হচ্ছে,   আরও জাঁকালো উৎসব  হচ্ছে এসবের।   কিছুদিন আগেই বাঙালি   হিন্দু মেয়েদের ‘সিঁদুর খেলা’ হল দূর্গা-প্রতিমা বিসর্জনের দিন   পরস্পরের মাথায় মুখে গালে কপালে চিবুকে  নাকে কানে  সিঁদুর মাখামাখি চললো। এই উৎসবটা   মূলত—‘স্বামী দীর্ঘজীবী হোক, অনন্তকাল বেঁচে থাকুক, স্বামীর অসুখ-বিসুখ না হোক,  দুর্ঘটনা না ঘটুক, স্বামী সুস্থ থাকুক, কস্মিনকালেও  না মরুক, আমাদের যা- ইচ্ছে-তাই হোক, আমাদের সুস্থতা গোল্লায় যাক, আমাদের দীর্ঘজীবনের বারোটা বাজুক’এর উৎসব।        বিধবা আর অবিবাহিতদের জন্য  সিঁদুর খেলা বারণ। বারণ, কারণ তাদের   স্বামী নেই! মাথায় তাদের সিঁদুর ওঠেনি, অথবা সিঁদুর মুছে ফেলা হয়েছে।  

প্রাপ্ত বয়স্ক দু'জন মানুষ বিয়ে করলো, দিব্যি একজনের  শরীরে  শাঁখা সিঁদুর পলা লোহার উপদ্রপ চাপানো হয়,   আরেকজনের শরীর আক্ষরিক অর্থে রয়ে যায় যেমন ছিল তেমন।  কেউ কি  এই প্রশ্নটি করে  যে, যে কারণে বিবাহিত মেয়েরা   শাঁখা   সিঁদুর পলা লোহা পরছে, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত পুরুষেরা   শাঁখা   সিঁদুর পলা লোহা পরছে না? অথবা যে কারণে বিবাহিত পুরুষেরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা  পরছে না, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত মেয়েরা  ওসব পরা থেকে বিরত থাকছে না?

সাফ কথা হলো, পুরুষ বিশ্বাস করে  এবং নারীকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে   যে এই বিশ্ব- ব্রহ্মাণ্ডে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটি, মানুষ   প্রজাতির মধ্যে পুরুষ নামক যে প্রাণীটি আছে, তার উরুসন্ধিতে   দুই বা তিন ইঞ্চি দৈর্ঘের যে লিঙ্গটি ঝুলে থাকে, সেটি।  সেটি যাদের আছে, তাদের  গায়ে কোনও   উপদ্রপ চাপাতে  হয় না! তাদের জীবন- সঙ্গী বা স্ত্রীটির    সুস্থ থাকার জন্য,  তার পরমায়ুর জন্য কোনও ব্রত পালন করতে হয় না,  তার ধনদৌলত লাভের জন্য ভগবানের কাছে  প্রার্থণা করার কোনও আচার অনুষ্ঠানে করতে হয় না, স্ত্রীর মঙ্গলকামনায়  তাদের দিনভর উপোস করতে হয় না,   সিঁদুর খেলতে হয় না,  যেমন স্ত্রীদের খেলতে হয়  স্বামীর মঙ্গলকামনায়! পুরুষেরা  বরং  বেশ জমিয়ে নারীকূলের পুংলিঙ্গ পুজো   দূর থেকে উপভোগ করেপুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যে যে পুজোটি চলে, সে   পুংলিঙ্গ পুজো। পুরুষেরা সমাজের ঈশ্বর, সমাজের মহাশক্তিমান, মহাক্ষমতাবান, পুরুষেরা নারীর প্রভু, অভিভাবক, অধীশ্বর, নারীর  কর্তা, দেবতা। পুরুষের  আরও  শক্তি, আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, প্রতাপ এবং প্রাচুর্য বৃদ্ধির  জন্য, পুরুষের দীর্ঘজীবন  এবং  অমরত্বের জন্য, নারীদের, দুর্বলদের, দুর্ভাগাদের, দলিতদের, নির্যাতিত, নিপীড়িতদের উপোস করতে হয়,  প্রার্থণা করতে হয় ভগবানের কাছে। পুরুষের মঙ্গলকামনায়, সুখকামনায়, স্বাস্থ্যকামনায় ভাইফোঁটা, শিবরাত্রি, রাখি, শ্রাবণ সোমবার কত কিছুই না সারাবছর পালন করছে নারীরা!

নারী শিক্ষিত হচ্ছে, এমনকী স্বনির্ভর হচ্ছে, স্বামীর ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেকের  প্রায় নেই বললেই চলে, স্বামী ছাড়া চলবে না--এমন কোনও ব্যাপারই নেই, এমন নারীও    পুরুষতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাগুলো  দিব্যি মাথা পেতে মেনে নিচ্ছে। কেউ প্রশ্ন করছে না,     বিয়ের পর  কেন নারীর পদবী পাল্টাতে হবে,   পুরুষের পদবী নয়?  কেন নারীকে তার শ্বশুরবাড়িতে  বাস করতে হবে,  কেন স্ত্রীর মতো পুরুষের কর্তব্য নয়  শ্বশুরবাড়িতে  বাস করা আর শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করা? পণের নিয়ম যদি পালন করতেই হয়,  তবে শুধু স্ত্রী কেন   স্বামীকে দেয়,  স্বামী  কেন স্ত্রীকে পণ দেয়  না?  যার  আছে, তারই শুধু চাই চাই!  গোটা সমাজ তাকেই ঢেলে দিচ্ছে, তাকেই ভরে দিচ্ছে,   যার অনেক আছে।   অত্যাচারীকে  করছে আরও দ্বিগুণ অত্যাচারী    ছলে বলে কৌশলে মেয়েদের দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা, তার ওপর ধরে বেঁধে যোগ করা  হয়েছে শারীরিক আর  মানসিক পরনির্ভরতা।  

ভারতবর্ষের বেশ কিছু  রাজ্যের বিবাহিত মেয়েরা ‘করবা চৌথ’ পালন করে। সুর্যোদয় থেকে চন্দ্রোদয় অবধি স্বামীর সুস্বাস্থের   জন্য উপোস। চাঁদ দেখবে তবে জলস্পর্শ করবে লক্ষ লক্ষ পতিব্রতা স্ত্রীএটিও ওই পুংপুজো। এই সব আচার অনুষ্ঠানের একটিই সারকথা,  সংসারে স্ত্রীর   নয়, স্বামীর জীবনটি মূল্যবান।  দরিদ্র-অশিক্ষিত-পরনির্ভর মেয়েরা নয়, পুরুষতান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠানগুলো  বেশির ভাগই   পালন করছে উচ্চবিত্ত- মধ্যবিত্ত  শ্রেণীর শিক্ষিত স্বনির্ভর মেয়েরা। এই মেয়েরাই কিন্তু আজকাল ধর্ষণ এবং অন্যান্য নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে খুব সরব, কিন্তু সিঁদুর খেলা বা করবা চৌথ পালন করছে রীতিমত উৎসব করে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, করভা চৌথ, সিঁদুর খেলা--সবই পুরুষতন্ত্রের নারীবিরোধী উপসর্গ। একসময় ধর্ষণকে অপরাধ ভাবা হত না,  ইদানীং ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের ফলে   ধর্ষণকে ভয়াবহ অপরাধ বলে ভাবা হয়। যদি করবা চৌথএর বিরুদ্ধে মিডিয়া মুখর হয়,  মানুষ পথে নামতে থাকে, করবা চৌথকেও বড্ড অন্যায় কাজ বলে ভেবে নেবে বেশির ভাগ মানুষ। 


নারীবিরোধী  এসব অনুষ্ঠান নিয়ে   আজকাল তুমুল বাণিজ্যও হচ্ছে।  করবা চৌথের চোখ ধাঁধানো উৎসব এখন সিনেমায়, থিয়েটারে,  টিভি সিরিয়ালে। বিজ্ঞাপনে পুরুষতান্ত্রিক আচারাদিতে অলংকৃত লাস্যময়ী নারীদের   ঝলমলে   দৃশ্য।    যে মেয়েরা  দূর থেকে দেখে এসব, দুঃখ দুর্দশার জীবন যাদের, তাদের ইচ্ছে হয়   সাজগোজ করা  ফর্সা ফর্সা সুখী সুখী  মেয়েদের মতো   উৎসব করতে। তারাও একসময়   বাণিজ্যের ফাঁদে  পা দেয়, শাড়ি গয়না কেনার ফাঁদে।  এমনিতেই এই সমাজ মেয়েদের  পণ্য বলে ভাবে।  পুংপুজোর আচারে অংশ নিয়ে  মেয়েরা নিজেদের আরও      পণ্য করে তোলে।  এসব করে যত বেশি পুরুষকে মূল্যবান করে মেয়েরা, ততবেশি নিজেদের মূল্যহীন করে। পুরুষতান্ত্রিক অসভ্যতাকে, অসাম্যকে, লিঙ্গবৈষম্যকে, নারীবিরোধিতাকে, নারীবিদ্বেষকে, নোংরামোকে  কেবল সহনীয় নয়, আদরণীয় আর আকর্ষণীয় করার  পায়তারা চলছে চারদিকে। যেসব রাজ্যে করবা চৌথ পালন হতো না, এখন সেসব রাজ্যেও   পালন হয়। পুরুষতণ্ত্র বড্ড সংক্রামক। 

মানুষ সামনে এগোয়। সভ্য হয়। বৈষম্য ঘোচায়।   সমাজ বদলায়  কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে মেয়েরা  যত শিক্ষিত  হয়,  যত নিজের পায়ে দাঁড়ায়, ততই পিতৃতন্ত্রকে মাথায় তুলে নাচা হয়,  ততই  ধর্মের ঢোল বাজানো হয়। ওপরে ওপরে মনে হয় সমাজ বদলেছে, কিন্তু  ভেতরে ভেতরে  হাজার বছরের পুরোনো সমাজ তার পচা গলা শরীর নিয়ে      অন্ধকারে ঠাঁয় বসে আছে,  তাকে নাড়ায় সাধ্য কার!

এই সমাজ নারীকে নানাভাবে উৎসাহিত করে পুরুষতন্ত্রের শিকার হতে।  পুরুষের অধীনতা   মেনে নিলে   সমাজ নারীকে  বাহবা দেয়।  নিজের অধীনে নয়, নারী যেন  কোনও না কোনও পুরুষের অধীনে থাকেনারীর অধীনতাকে বা   পরাধীনতাকে   ‘নারীর গুণ’ হিসেবে ধরা হয়।    গুণবতী নারী হওয়ার এই পুরস্কারটি যার জোটে, সমাজ তার ওপর খুব খুশি থাকে। সমাজকে খুশি করতে মেয়েরা যে করেই হোক  চায়।  কারণ একে  অখুশি রেখে বা  অসন্তুষ্ট রেখে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।   

পুংরা যে সমাজে   প্রতিদিন বধূহত্যা করছে, বধূনির্যাতন করছে,   ধর্ষণ করছে, গণধর্ষণ করছে,   কন্যাশিশু হত্যা করছে, সেই সমাজে      ড়ম্বর করে মেয়েরাই    পুংপুজো   করছে।  পুংপুজোর   দৃশ্য দেখে মাঝে মাঝে আঁতকে  উঠি।     পুংদের বোধোদয় কি আদৌ ঘটবে কোনওদিন?    পুংআধিপত্যবাদের  কৌশল শিখে বেড়ে ওঠা পুরুষেরা কি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারবে  যা শিখেছে সব? ঝেড়ে না ফেললে সমানাধিকারের শিক্ষাটা গ্রহণ করায় যে খুব মুশকিল হবে!


সমানাধিকারের  কোনও চর্চাই   নেই  নারী পুরুষের সম্পর্কে। পুরুষ মনে করে  তার  পুরুষত্ব খানিকটা খসে গেলে   বুঝি অপমান হবে তার, নারী  মনে করছে তার নারীত্ব কিছুটা কমে গেলে রক্ষে নেই।   এক একজন প্রাণপণে বজায় রাখতে চায় পুরুষ আর নারীর জন্য সমাজের বানানো কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পুরুষত্ব, আর নারীত্বযদি ধরেই নিই পুরুষের ভেতর তথাকথিত এই পুরুষত্ব আর নারীর ভেতর তথাকথিত এই নারীত্ব আছে, তারপরও কিন্তু নিশ্চয় করে বলা যায় যে  পুরুষের ভেতরে যা আছে তার  একশভাগই পুরুষত্ব, নারীর ভেতের যা আছে তার একশভাগই নারীত্ব --এ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সমাজ চোখরাঙায় বলে  পুরুষ  প্রকাশ করতে চাইছে না তার ভেতরে  যেটুকু নারীত্ব আছে সেটুকুনারীকে  প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হয়  তার ভেতরের পুরুষত্বটুকুযদি সমাজের  বাধা না থাকতো, যদি  সত্যি সত্যি খুলে মেলে ধরতে পারতো  নিজেদের সত্যিকার চরিত্র,   তাহলে সমতা আসতো সম্পর্কে। পুরুষও কষ্ট পেলে হু হু করে কাঁদতো, শিশুপালন  করতো, ভালোবাসার মানুষকে   রেঁধে খাওয়াতো, তার শাড়ি কাপড় কেচে ইস্ত্রি করে রাখতো  কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে মাথার ওপর বসে খবরদারি করছে। পুরুষকে শুধু নৃশংসতা করে যেতে হবে, নারীকে শুধু সর্বংসহার মতো  সয়ে যেতে হবে!  যতই যা হোক,  নারী কিন্তু প্রমাণ করেছে পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। নারী   পুরুষের মতোই পোশাক পরতে পারে, পুরুষের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পারে, পুরুষের মতোই   পাহাড়ের চুড়োয় উঠতে পারে, মহাশূন্যে পাড়ি দিতে পারে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাণিজ্য করতে যেতে পারে। পুরুষ কিন্তু আজও  প্রমাণ করতে পারছে না নারী যা পারে, তা পুরুষও  পারে। ঘরদোর সাফ করা, সংসারের  রান্নাবান্না করা, খাবার পরিবেশন করা,  শিশুর লালন পালন  এখনও করছে না পুরুষেরা। যতদিন না করবে, ততদিন এ কথা বলার উপায় নেই যে সংসারে বৈষম্য নেই। 



যতদিন সমাজে পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র টিকে আছে, ততদিন এই সমাজ কাউকে সমতার আর  সমানাধিকারের দিকে হাত বাড়াতে দেবে না। হায়ারার্কি বা  স্তরতন্ত্র  কিন্তু গড়ে  উঠেছে পেট্রিয়ার্কি বা  পিতৃতন্ত্রের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই।   স্তরতন্ত্রে     অধীনতা এবং আধিপত্যের অবসান ঘটানো, অথবা ক্ষমতার উঁচু নিচু স্তরকে ভেঙে সমান করে দেওয়া  সম্ভব নয়। সম্ভব করতে হলে স্তরতন্ত্রটাকেই আগে বাতিল করতে হয়।  নারী পুরুষের সমতাও পিতৃতন্ত্রের বিলুপ্তি না হলে কখনও সম্ভব নয়।   ‘পণপ্রথা বন্ধ করো’,  ‘ধর্ষণ বন্ধ করো’, বধূ নির্যাতন বন্ধ করো’ বলে বলে সারাবছর চেঁচালেও এসব উপসর্গ কখনও উবে যাবে না। যতদিন রোগটা আছে,      উপসর্গগুলো   ঘাপটি  মেরে থেকেই যাবে। রোগটা সারাতে হবে।

Monday, 21 October 2013

দেশ বলতে ঠিক কী বোঝায়?





দেশ বলতে ঠিক কী বোঝায়   সম্ভবত আমি  এখন আর জানি না।  আজ কুড়ি বছর  দেশের বাইরে। আজ কুড়ি বছর নিজের দেশে প্রবেশ করার এবং বাস করার   অধিকার আমার নেই। আমার নাগরিক অধিকার  লঙ্ঘন করছে, যারাই ক্ষমতায় আসছে,  তারাই। আমাকে হেনস্থা করা, অপমান করা, অপদস্থ করা, অসম্মান করা, আমাকে গলা-ধাক্কা দেওয়া, লাথি দেওয়া, ঘরবার করা যত সহজ, তত আর কাউকে যে সহজ নয়, তা ক্ষমতায় যারা বসে থাকে, তারা বেশ ভালো জানেআমি কি কোনও অন্যায় করেছি, মানুষ খুন করেছি, চুরি ডাকাতি করেছি? কারও কিছু লুট করেছি, কাউকে সর্বস্বান্ত করেছি? না, তা  করিনি। রাজনীতি করেছি,  নিজের সুবিধে চেয়েছি, লোক ঠকিয়েছি? না, তাও নয়। তবে কী করেছি যে যার শাস্তি চিরকালের নির্বাসন? কী করেছি যে হাসিনা খালেদা তত্ত্বাবধায়ক-- সব সরকারের বেলায় আমাকে আমার নিজের দেশে ঢুকতে  দেওয়া হবে না এই একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? কোনও একটি  বিষয়ে, সব রাজনীতিবিদদের কোনও  সিদ্ধান্তে  কি এমন চমৎকার মিল পাওয়া যায়? কোনও একটি মানুষের বিরুদ্ধে চরম অন্যায় করে কি কোনও সরকার এমন  পার পেয়ে যায়? কোনও একটি মানুষের ওপর নির্যাতন হচ্ছে দেখেও দেশের সব মানুষ কি এমন মুখ বুজে থাকে, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ?  এমন অদ্ভুত কাণ্ড সম্ভবত ইতিহাসে নেই। কোনও লেখকের এত বই কোনও দেশের কোনও  সরকার নিষিদ্ধ করেনি। লেখকদের নির্বাসনে পাঠানো হয়, তবে সরকার বদল হলে লেখকেরা আবার ফিরে যায় নিজের দেশে। আমি নিজের দেশে ফিরতে পারি না। কারণ আমার দেশে সরকার বদল হয়, সরকারের বদমাইশি বদল হয়না। আমার দেশের সব সরকার মনে করে, দেশটা তাদের বাপের সম্পত্তি। সুতরাং তাদের  বাপের সম্পত্তিতে পা দেওয়ার কোনও অধিকার আমার  নেই।


পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিদেশে এলে তাঁকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘তসলিমাকে কেন দেশে যেতে দিচ্ছেন না?’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি উত্তর দেন, ‘ওর তো দেশে যেতে কোনও বাধা নেই, ও যাচ্ছে না কেন?’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন তিনি মিথ্যে   বলছেন। তিনি নিশ্চয়ই ভালো করেই জানেন যে বাংলাদেশের সমস্ত  দূতাবাসকে সরকার থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে যে আমার বাংলাদেশ-পাসপোর্ট যেন নবায়ন করা না হয় এবং আমার ইওরোপের পাসপোর্টে যেন বাংলাদেশের ভিসা দেওয়া না হয়। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে দেশের মন্ত্রণালয়ে আমার পাসপোর্ট নবায়ন করার ভুরি ভুরি দরখাস্ত   পাঠানো হয়েছে  প্রায় দু’যুগ যাবৎ, উত্তরে জুটেছে  না অথবা নৈঃশব্দ।  প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী  এবং  যাবতীয় সকল মন্ত্রীই জানেন ভ্যালিড পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া  দেশের পথে রওনা হওয়া কোনও জাহাজে বা   ড়োজাহাজে উঠতে আমি পারবো না, দেশের মাটিতে পা রাখা তো দূরের কথা। মিথ্যে বলার কী প্রয়োজন! সরাসরি বলেই দিতে পারেন, ‘আমরা ওকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছি না, দেবোও নাকারণ আমরা যা খুশি তাই করার লোক। এ নিয়ে বিরোধী দল কোনও প্রশ্ন করবে না,  দেশের জনগণও রা-শব্দ করবে না, তবে আর ওর নাগরিক অধিকার নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা কেন হবে!’

আমি চিকিৎসাবিজ্ঞান  ড়েছি। ডাক্তারি করেছি দেশের সরকারি  হাসপাতালগুলোয়। ছোটবেলা  থেকে লেখালেখির অভ্যেস,  তাই ডাক্তারির পাশাপাশি  ওটি চালিয়ে গেছি। মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতন দেখে কষ্ট পেতাম, মানুষের দুঃখ দুর্দশা ঘোচাতে চাইতাম; লিখতাম-- যেন সমাজ থেকে কুসংস্কার  আর অন্ধত্ব দূর হয়,  মানুষ  যেন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, আলোকিত হয়,  যেন  কারোর মনে হিংসে, ঘৃণা, ভয় আর না থাকে, যেন মানুষ মানুষকে  সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে।  লিখেছি, বই  প্রচণ্ড  জনপ্রিয়ও হয়েছে, কিন্তু জনপ্রিয় বইগুলোই সরকার     নিষিদ্ধ করতে শুরু করলো। এক সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্য সরকারও বই নিষিদ্ধ করেছে। নিষেধাজ্ঞা ব্যাপারটি বড্ড সংক্রামক। একবার নিষিদ্ধ করে যদি দেখা যায়  কোনও প্রতিবাদ হচ্ছে না, তখন নিষিদ্ধ করাটা নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়।  আমার বইগুলো যেন সরকারের খেলনার মতো। খেলনা নিয়ে যা খুশি করেছে, ভেঙেছে, ছুড়েছে, মাস্তি  করেছে। খালেদা সরকার ‘লজ্জা’ নিষিদ্ধ করেছে, লজ্জা ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটি মানবিক দলিল। ‘আমার মেয়েবেলা’ নামের বইটি, যেটি হাসিনা সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেটি  বাংলা সাহিত্যের ব  পুরস্কার ‘আনন্দ পুরস্কার’ ছাড়াও  বেশ কিছু বিদেশি পুরস্কার এবং বিস্তর প্রশংসা পেয়েছে। তারপর একে একে আমার আত্মজীবনীর বিভিন্ন খন্ড ‘উতল হাওয়া, ‘ক’, ‘সেইসব অন্ধকার’ নিষিদ্ধ হয়েছে।  কেউ আপত্তি করেনি বই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে। নাৎসিরা  জার্মানীতে বই পুড়িয়েছিল।   সেই বই পোড়ানোর দিনটি এখনও ইতিহাসের কালো একটি দিন। একের পর এক  আমার বই নিষিদ্ধ করে  বাংলাদেশ সরকার কি সেই বীভৎস নাৎসিদের মতোই   আচরণ করেনি!   মুশকিল হচ্ছে বেশির ভাগ সরকারই  সাহিত্যের   কিছু জানে না,  মত প্রকাশের  স্বাধীনতা সম্পর্কেও তাদের কোনও জ্ঞান নেই।  অথবা আছে  জ্ঞান, কিন্তু পরোয়া করে না। জনগণের সেবক গদিতে বসার সুযোগ পেলে শাসক বনে যায়, শোষক বনতেও খুব একটা সময় নেয় না।  

পাকিস্তানের মেয়ে মালালা ইউসুফজাই সেদিন ইওরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বমানবাধিকার  পুরস্কার (সাখারভ)পেলোমালালা   সাহসী এবং বুদ্ধিমতি একটি মেয়ে।  ওর পুরস্কার পাওয়ায় আমি বেশ খুশি।   বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমও  মালালার পুরস্কার পাওয়ায় এত খুশি যে খবরটার ব্যাপক প্রচার করেছে।  মালালা যে সাখারভ পুরস্কারটি এ বছর পেয়েছে, সেই পুরস্কারটিই  আমি পেয়েছিলাম ১৯৯৪ সালে। গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশের  সংবাদমাধ্যম কিন্তু একটি অক্ষরও  খরচ করেনি   নিজের দেশের মেয়ের পুরস্কার  নিয়ে। ফরাসী সরকারের দেওয়া  মানবাধিকার পুরস্কার বা সিমোন দ্য বুভোয়ার পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার,   বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট – আমার কোনও সম্মান বা পুরস্কার  পাওয়ার দিকে   বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ফিরে তাকায়নি।  সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটায়  বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোআমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও   আজ অবধি কোনও রাষ্ট্রদুত    উপস্থিত থাকেননি  আমাকে সম্মানিত করার  কোনও অনুষ্ঠানে। ইওরোপ আমেরিকা কাউকে ব কোনও সম্মান দিলে তার  দেশের রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানায়  সম্মান-বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। এই সেদিন বেলজিয়ামের ‘রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স,আর্টস এণ্ড লিটারেচার’ থেকেও যখন অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছি, অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট যথারীতি আমার দেশের রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যথারীতি রাষ্ট্রদূত  অনুপস্থিত। প্রেসিডেণ্ট সম্ভবত অনুমান করেছেন  রাষ্ট্রদূত লোকটা ছোটলোক। সবচেয়ে বেশি ছোটলোকি করেছিলেন কুড়ি বছর আগে বেলজিয়ামে যে  বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তিনি, বিশাল একটা চিঠি লিখেছিলেন ইওরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেণ্টের কাছে, কাকুতি মিনতি করেছিলেন আমাকে যেন সাখারভ পুরস্কারটি কিছুতেই না দেওয়া হয়। প্র্রেসিডেন্ট আমাকে রাষ্ট্রদূতের   চিঠিটি পড়তে দিয়েছিলেন, আর ফেরত নেননিপরদিন ঘটা করে আমাকে সাখারভ পুরস্কার দিয়েছিলেন।

প্রতিবারই যখন সম্মানিত হয়েছি, লজ্জা হয়েছে দেশটির জন্য। আজও হয়। আমার বাবা যখন মৃত্যুশয্যায়, প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আমি অনেক অনুরোধ করেছিলাম  আমাকে যেন   অন্তত দু’দিনের জন্য হলেও দেশে যেতে দেন তিনি। আমার বাবা কী যে ব্যাকুল ছিলেন  আমাকে একটিবার  দেখার জন্য। দিনের পর দিন কেঁদেছেন।  হাসিনা আমাকে দেননি   দেশে যেতে। হয় তিনি  নিজের বাবা ছাড়া আর কারোর বাবাকে মর্যাদা দেন না,  নয় তিনি  নিজের বাবাকে  সত্যিকার ভালোবাসেন না, বাবা নিয়ে রাজনীতি করতে ভালোবাসেন।  নিজের বাবাকে ভালবাসলে কেউ এভাবে  অন্যের বাবাকে  বঞ্চিত করেন না, বিশেষ করে  যখন কোনও বাবা তাঁর কন্যাকে একবার শেষবারের মতো দেখতে চান কন্যার হাত  একবার শেষবারের মতো  স্পর্শ করার জন্য মৃত্যুশয্যায় যখন কাঁদেন, তাঁকে কোনও শত্রুও বলে না, না।

জীবনে মৌলবাদীদের অত্যাচার অনেক  সয়েছি, ওদের জারি করা ফতোয়া, মামলা,   ওদের হরতাল, মিছিলকিছুই আমাকে এত দুঃখ দেয়নি যত দিয়েছে   আমার অসুস্থ বাবার কাছে আমাকে একটিবারের জন্য যেতে না দেওয়ার কুৎসিত সরকারি সিদ্ধান্ত  আমাকে মৌলবাদীরা দেশ থেকে তাড়ায়নি, তাড়িয়েছে সরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে,  বাংলাদেশ থেকে যেভাবে তাড়ানো হয়েছিল,   পশ্চিমবঙ্গ থেকেও ঠিক সেভাবেই  তাড়ানো হয়েছে, ওই একই কারণে, ধর্মীয় মৌলবাদীদের মুখে হাসি ফোটাতে।

কিছু দূরদৃষ্টিহীন স্বার্থপর রাজনীতিকের কারণে আজ আমি নির্বাসিত। একজন আপাদমস্তক বাঙালি লেখকের আজ  বাংলায় ঠাঁই নেই। বাংলা ভাষা থেকে   সহস্র  মাইল   দূরে বসে বাংলার মানুষের জন্য আমাকে বাংলা ভাষায় বই লিখতে হচ্ছে। কী জঘন্য,   কী নির্মম, কী ভয়ংকর এই  শাস্তি!  কী অপরাধ আমার? নিজের মত প্রকাশ করেছিলাম বলে, যেহেতু আমার   মত  কিছু  মূর্খ, ধর্মান্ধ, আর নারীবিদ্বেষী লোকের মতের চেয়ে ভিন্ন?  

তারপরও ভালোবাসার মরণ হয় না। মা নেই, বাবা নেই। যাঁরা ভালোবাসতেন, তাঁরা কেউ নেই। শামসুর রাহমান নেই, কে এম সোবহান, কবীর চৌধুরী, রশীদ করীম, ওয়াহিদুল হক নেই, দেশটা খাঁ খাঁ করছে। তারপরও দেশের জন্য, দেশে ফেলে আসা সেই নদীটা, সেই ইস্কুলঘরটা,  শৈশবের সেই উঠোনটা, খেলার সেই মাঠটা, মা’র   লাগানো সেই কামিনী গাছটা, সেই নারকেল, সেই কামরাঙা, সেই পেয়ারা গাছটার জন্য মন কেমন করে। কেউ নেই, কিছু নেই, সব বদলে গেছে, দেশ আর সেই দেশ নেই, কিন্তু তারপরও দেশ শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর একটা কষ্ট টের পাই। এই কষ্টটার আমি  কোনও  অনুবাদ   জানি না।

অনেকে জিজ্ঞেস করে,   ইওরোপের নাগরিক হয়েও, আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কেন আমি দিল্লিতে বা ভারতে থাকি। আমি   বলি, ‘এখানে থাকি, এখানকার গাছগুলোর নাম জানি বলে’। যারা প্রশ্ন করে, জানি না তারা ঠিক বুঝতে পারে কি না কী বলছি। এই শাল, সেগুন গাছ, এই কৃষ্ঞচূড়া, এই শিমুল, এই কাঁঠালিচাপা  আমি শৈশব থেকে চিনি  এই গাছগুলো যখন দেখি,  মনে হয় বুঝি দেশে আছি। হিন্দি আমার ভাষা নয়, কিন্তু এই ভাষাটির ভেতর   সংস্কৃত শব্দগুলো বাংলার মতো শোনায়, সে কারণেই কি ইওরোপ আমেরিকায় না থেকে এখানে থাকি!  আর এই যে কদিন পর পরই যমুনার পাড়ে যাচ্ছি, সে কেন? কী আছে ওই নদীটায়! একদিন পাড়ে দাঁড়িয়েই এক চেনা ভদ্রলোককে বলেছিলাম, ‘জানো, আমার দেশেও  একটা নদী আছে, নদীটার নাম যমুনা’।  ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু ওই নদী আর এই নদী তো এক নয়’।  বললাম, ‘তাতে কী! নাম তো এক’।  

 

সেদিন দেখলাম দুটো পায়রা উড়ে এসে আমার জানালার ওপারে বসলো, আমার  মা যেরকম পায়রা পুষতো, ঠিক সেরকম দুটো পায়রাতাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল চলে এসেছিল। সন্ধ্যের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াই। কৈশোরে বেজায় ভালোবাসতাম  সেই বেলি ফুলের ঘ্রাণ! ঘ্রাণটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে হেঁটে যাই, ঝাড় জঙ্গল  যা কিছু পড়ুক সামনে, হেঁটে যাই। আর, এদিকে আমার বারান্দার টবে পুঁতেছি   হাসসুহানার চারা। আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ছিল হাসনুহানা। ওর সুঘ্রাণ আমাদের ঘুম পাড়াতো। জানিনা, কী এর নাম! এই বার বার পেছন ফিরে তাকানোর! কী    নাম এর!  


এই কুড়ি বছরে পৃথিবীর পথে অনেক হেঁটেছি। মানুষের  ভালোবাসা  পেয়েছি অনেক   যারা ভালোবাসে, যারা    আমার মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে   দাঁড়ায়, আমার নীতি আর আদর্শে বিশ্বাস যাদের, যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমার মতোই সরব, তাদের আমার ‘দেশ’ বলে  মনে হয়তারা পাশে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করি।  দেশ মানে আমি ভালোবাসা বুঝি, নিরাপত্তা বুঝি যে দেশ ঘৃণা করে, ছুড়ে ফেলে, ভয় দেখায়,   সে দেশকে দেশ বলে কেন মনে হবে! জন্ম দিলেই তো মা হওয়া যায় না, মা হতে গেলে ভালোবাসতে হয় সন্তানকে। দেশ তো কেবল মাটি,  নদী, গাছপালা, আর বাড়িঘর নয়। দেশ এসবের চেয়েও  আরও বড়, অনেক বড়  

বেঁচে থাকতে সম্ভবত আমার দেশটিকে  খুব উদার বা  মানবিক  হতে দেখবো না, কিন্তু অপেক্ষা করবো এমন দিনের, যেদিন দেশটিকে নিয়ে গর্ব করতে পারি অপেক্ষা করবো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।