Saturday, 31 August 2013

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে






ব্রহ্মপুত্রের  পাড়ে  নামে একটি  ছোট উপন্যাস লিখেছি গত বছর। বইটি পড়ে আমার চেনা জানা সবাই বললো এটি নাকি আমার জীবন কাহিনী। তাদের ভাষ্য, যমুনা আমি, আমিই। যমুনা আমি ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না। কিন্তু যমুনার সঙ্গে আমার জীবনের কোনও কিছুর মিল নেই। 

সুস্মিতা ভট্টাচার্যের সঙ্গে এ নিয়ে সেদিন কথা হলো। 
-তোমার ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বইটা পলাম। খুবই  ভালো লেগেছে। এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। আমি এখন যমুনার সঙ্গে কথা বলছি, ভাবতেই ভালো লাগছে। 
-যমুনার সঙ্গে মানে?
-যমুনার সঙ্গে, মানে তোমার সঙ্গে। 
-সুস্মিতাদি, কী কারণে তোমার মনে হচ্ছে, যমুনা আমি?
-মনে হচ্ছে কারণ তোমার জীবন কাহিনীই তো লিখেছো তুমি।
-কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে তো আমার আত্মজীবনী নয়, এটা একটা উপন্যাস।
-হ্যাঁ উপন্যাস, তবে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস।
-আমার নাম তো যমুনা নয়। যমুনা বাংলাদেশের মেয়ে বলে বলছো? আমার  উপন্যাসে বাংলাদেশ, ময়মনসিংহ, ব্রহ্মপুত্র খুব থাকে। আমার জন্ম আর  হওয়া ওই দেশে আর ওই শহরে আর ওই নদের পাড়ে বলেই সম্ভবত। তার মানে কিন্তু  এই নয় যে আমি উপন্যাসের ওই  যমুনা।
-তোমার নাম যমুনা নয়, নামটা পাল্টে দিয়েছো। 
-তাই বুঝি?  যমুনাকে  তার বাবা বিয়ে দিয়েছিল, আমাকে তো ওভাবে আমার বাবা বিয়ে দেয়নি।
-তা দেয়নি।
-যমুনা ডিভোর্স করার পর   তার এক  প্রেমিকের সঙ্গে শুয়ে একটা  বাচ্চা নিয়েছিল। এরকম কোনও ঘটনা আমার জীবনে নেই। আমার কোনও বাচ্চা  নেই।
-তা নেই।
-যমুনা ফিজিক্সে পিএইডি করেছিল। চাকরি করতো সোলার এনার্জিতে।  আমি ফিজিক্সেও পড়িনি,  ফিজিসিস্ট হিসেবে চাকরিও কোথাও করিনি।
-তা করোনি।
-যমুনা খুন করেছিল তার প্রেমিককে। আমি কাউকে খুন করিনি।
-তা করোনি।
-যমুনা দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল খুনের  বিচার থেকে বাঁচতে। আমি দেশ থেকে পালাইনি।
-তুমি দেশ ছেড়েছিলে।
-দেশ ছাড়তে আমাকে বাধ্য করেছিল সরকার।  রাজনৈতিক কারণে। দুটো দেশ ছাড়ার কারণ এক নয়।
-তা নয়।
-যমুনা একটা মালায়ালি ছেলেকে বিয়ে করে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিল, যখন সোলার এনার্জির ওপর গবেষণা করছিল কেরালায়। আমি কেরালায় কোনও কিছু নিয়ে গবেষণা করিনি, ভারতের কোনও লোককে বিয়েও করিনি, ভারতের কোনও নাগরিকত্বও নিইনি।
-তা নাওনি।
-যমুনা কলকাতায় গিয়েছিল কেরালা থেকে। কলকাতায় চাকরি করতো। বাড়ি কিনেছিল, মেয়েকে ভালো ইস্কুলে পাতো। এসবের কিছুই আমার জীবনে ঘটেনি। আমি কলকাতায় থেকেছি বটে, তবে   চাকরি করিনি।  বাড়িও কিনিনি। 
-তা ঠিক।
-যমুনার  লেসবিয়ান রিলেনশিপ ছিল। নির্মলা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে  থাকতো। কলকাতায় আমি একা ছিলাম।   কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না।
-তা ঠিক। ছিল না।
-যমুনার মেয়ে হারভার্ডে পতো। আমার কোনও ছেলে বা মেয়ে নেই,  হারভার্ডেও  ড়ে না।
-তা ঠিক।
-যমুনা মরে গেছে। আমি মরিনি।
-তা মরোনি।
-যমুনা আত্মহত্যা করেছে। আমি আত্মহত্যার বিরুদ্ধে। যমুনার বোন এসে যমুনার মৃতদেহ নিয়ে যায় দেশে। আমি মরিওনি, আমার মৃতদেহ কেউ নিয়েও যায়নি কোথাও।
-তা যায়নি।
-তাহলে কেন বলছো আমি যমুনা?
-তুমি যা বলছো তা আমি মানছি। তারপরও বলবো তুমি যমুনা।
-কেন? যমুনা সাহসী ছিল বলে?  আর আমাকেও সাহসী হিসেবে মনে করো বলে?   কিন্তু   সাহসী মেয়েদের গল্প তো হামেশাই লিখছে লেখকরা। আর,  যমুনাকে আমার কিন্তু খুব সাহসী মেয়ে বলে  মনে হয় না। সাহস থাকলে ও আত্মহত্যা করতো না।
-তা ঠিক।
-এখনও  বলবে  আমিই যমুনা? নিশ্চয়ই নয়।
-আসলে তুমি যতই অস্বীকার করো না কেন, তুমিই যমুনা। 
এরপর আমি আর কথা বলার উৎসাহ পাইনি।  কী কারণে আমার উপন্যাসের চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে ভাবা হয়, আমি জানি না। সে কি  কয়েক বছর আমার আত্মজীবনী পছে বলে গুলিয়ে ফেলে সব?  উপন্যাস আর আত্মজীবনীর পার্থক্য ঠিক বুঝতে পারে না? ঠিক বুঝি না এ লেখকের দোষ, নাকি পাঠকের দোষ? যমুনা যে কাজগুলো করেছে, তার কিছুই আমি করিনি। যমুনা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায় আমি কথা বলি না। তবে কী কারণে আমাকে যমুনা বলে ভাবা হয়! যমুনার জন্ম ময়মনসিংহে, জীবনের কিছুটা   সময় কলকাতায় বাস করেছিল, যমুনার এক বোন আছে, আমেরিকায় থাকে, যমুনার ভাই  পারিবারিক সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে, এ ছাড়া যমুনার আর কোনও কিছুর সঙ্গে আমার কোনও কিছুর  মিল নেই। কিন্তু এই মিলটুকুর কারণে আমাকে যমুনা বলে মনে করাটা রীতিমত অযৌক্তিক।

 আমি তো আমার পরিচিত জগতের কথাই উপন্যাসে লিখবো, যা চিনি না জানি না তা কী করে লিখবো? লিখতে গিয়ে আমার নিজের জীবন, আমার চারপাশের জীবন,  আমার দেখা, শোনা এবং পড়া নানারকম জীবনের অভিজ্ঞতাই আমার গল্প উপন্যাসের চরিত্রে চলে আসে।  কিন্তু উপন্যাসের কোনও  চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে মনে হওয়ার কারণ কী? ---  হতে পারে লিখতে লিখতে আমার অজান্তে কোনও না কোনওভাবে আমি একাকার হয়ে যাই  সেই চরিত্রের সঙ্গে, সেই চরিত্র আর আমার চরিত্র ভিন্ন হলেও কোথাও না কোথাও দুটো চরিত্রের গভীর মিল থেকে যায়, খালি চোখে যে মিল দেখা যায় না, আর, দেখা গেলেও আমি হয়তো দেখিনা,   অন্যরা দেখে।  অথবা আমার যারা চেনা জানা,  যারা বলে আমার উপন্যাসের চরিত্র আমার চরিত্রই, তারা আমাকে চেনে বা জানে বলে বিশ্বাস করে, আসলে তারা আমার কিছুই চেনে না বা জানে না।



Sunday, 18 August 2013

বাঙালির বোরখা




 ষাটের দশকের শেষ দিকে আমি বিদ্যাময়ী  ইস্কুলে পড়ি। ময়মনসিংহে শহরের সবচেয়ে নামকরা মেয়েদের ইস্কুল। হাজারো  ছাত্রী, কিন্তু  কেউই কখনও বোরখা পরতো না।  কোনো ছাত্রী তো নয়ই, কোনও শিক্ষিকাও  নয়। বোরখার কোনও চলই ছিল না। খুব পর্দানশীল মৌলবী পরিবারের বয়স্ক মহিলারা বাইরে বেরোলে রিকসায়  শাড়ি পেঁচিয়ে নিত। ওদেরও পরার বোরখা ছিল না।    সত্তরের দশকে আমি ওই শহরেই রেসিডেন্সিয়াল মডেল ইস্কুলে পড়ি।  সারা ইস্কুলে  একটি  মেয়েই বোরখা পরতো। তখন বোরখা কিনতে পাওয়া যেত না।  পরতে চাইলে কাপড় কিনে বানিয়ে নিতে হত। মেয়েটির  বোরখাও কাপড় কিনে বানিয়ে নেওয়া। তার মৌলবী-বাবা  জোর করে তাকে বোরখা পরাতো। মেয়েটি আমাদের ক্লাসেই পরতো।  নাম ছিল হ্যাপি। লম্বা টিংটিঙে মেয়ে। আমিও ছিলাম হ্যাপির মতো লম্বা টিংটিঙে।  হ্যাপি তার বোরখাটা ইস্কুলের গেটের কাছে এসেই খুলে ফেলতো,  বোরখাটাকে   বইখাতার ব্যাগে ঢুকিয়ে  তবেই  ইস্কুলে ঢুকতো।  সে যে বোরখা পরে ইস্কুলে আসে তা কাউকে জানতে দিতে চাইতো না। কিন্তু   খবরটা একদিন ঠিকই জানাজানি হয়ে যায়। জানাজানি হওয়ার পর ইস্কুলের মেয়েরা সবাই হ্যাপিকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। হ্যাপি ক্লাসের  পেছনের বেঞ্চে বসতো বোরখা পরার লজ্জায়। সঙ্গে আবার পড়াশোনা ভালো না করার লজ্জাও ছিল।  আমি ভালো ছাত্রী হলেও সবার সঙ্গেই মিশতাম। হ্যাপির সঙ্গেও।   হ্যাপি খুব অসভ্য অসভ্য গালি জানতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা হ্যাপির মতো অত গালি জানতো না।  আমি তো আগে কোনওদিন শুনিনি ওসব গালি। হ্যাপি যখন ক্লাস নাইনে বা টেন-এ, তখন তার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিতে চাইছিল।  হ্যাপি তার হবু-স্বামীর কথা বলতো আর তার বাপ মা তুলে গালাগালাজ করতো। আমি অবাক হয়ে ওসব শুনতাম। ক্লাসের সবচেয়ে ডাকাবুকো মুখ-খারাপ মেয়ে কিনা বোরখা পরে। আর আমরা যারা কোনও গালি জানি না, আমরা যারা সরল সোজা ভালোমানুষ, তারা কোনওদিন বোরখার কথা কল্পনাও করিনি। বোরখা একটা হাস্যকর পোশাক ছিল ষাট আর সত্তর দশক জুড়ে। দু'একজন যারা পরতে বাধ্য হতো, তারা লজ্জায় রাস্তাঘাটে মাটির সঙ্গে মিশে থাকতো।

আশির দশকের শেষ দিকে শাড়ির ওপর একটা বাড়তি ওড়নার মতো কাপড় পরা শুরু হয়েছিল। নব্বই দশকের শুরুতেও তাই ছিল।   একটা বদ হাওয়া টের  পাচ্ছিলাম, প্রাণপণে রুখতে চাইছিলাম সেই বদ হাওয়া। সমাজের   ইসলামীকরণ এবং নারীবিরোধী ইসলামী আইনের প্রতিবাদ করেছিলাম।  সে কারণে আমাকেই   তাড়িয়ে  দেওয়া হল দেশ থেকে।  চুরানব্বই থেকে দেশের বাইরে। নির্বাসন জীবনে দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে সব খবর   রাখার সুযোগ  হতো না। হঠাৎ সেদিন, এই বছর দুয়েক আগে,  চমকে উঠেছি   কিছু ছবি দেখে। আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া  রজত  জয়ন্তী উৎসবের ছবি, যে উৎসবে আমার প্রচুর সহপাঠী   গিয়েছিল,  সবাই এখন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ছবিগুলোর সামনে আমি হতভম্ব, হতাশ বসে থেকেছি সারাদিন। প্রায় সব সহপাঠী মেয়ের  মাথায় হিজাব, কালো কাপড়ে কপাল অবধি ঢাকা, অত সুন্দর চুলগুলো সব লুকিয়ে ফেলেছে! আর প্রায় সব  সহপাঠী ছেলের মুখে দাড়ি নয়তো মাথায় টুপি, কপালে মেঝেয় কপাল ঠুকে নামাজ পড়ার কালো দাগ। এই ছেলেমেয়েগুলো পুরো আশির দশক জুড়ে আমার সঙ্গে ডাক্তারি  পড়েছে, কোনওদিন কাউকে এক রাকাত নামাজ পড়তে দেখিনি, কোনওদিন কাউকে আল্লাহর নাম মুখে নিতে   শুনিনি।  এমন  আধুনিক সব চিকিৎসাবিজ্ঞানী কি না হয়ে উঠেছে পাঁড় ধর্মান্ধ? কে এই বিজ্ঞানীদেরও মাথার খুলি খুলে গোবর  ভরে  দিয়েছে!   তবে কি সেই বদ হাওয়া, যেটিকে রুখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু রুখতে দেওয়া হয়নি,  সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল বিষাক্ত ভাইরাস,  যুক্তি বুদ্ধি চিন্তাশক্তি লোপ পাইয়ে দেওয়ার ভাইরাস?  যদি ডাক্তারদেরই এই হাল,   কল্পনা করতে পারি আর সব সাধারণ মানুষ এখন ধর্মান্ধতার কোন স্তরে   পৌঁচেছে। পৌঁচেছে না বলে সম্ভবত তাদের কোন স্তরে  পৌঁছোনো হয়েছে বলা ভালো। 


আজ দেশ থেকে একজন জানালো, মিতা হকের বক্তব্য নিয়ে দেশে  নাকি  হুলস্খুল কাণ্ড হচ্ছে। ইউটিউবে  কিছুক্ষণ আগে শুনলাম ওঁর কথা। চলতে ফিরতে   রাস্তাঘাটে বাজারে অফিসে যেখানেই যত মেয়েদের চোখে পড়ে, প্রায় সবারই পরনে নাকি থাকে কালো বোরখা, শুধু চোখদুটো খোলা, যেন হোঁচট না খায়! প্রায় সবাই  তবে  চলমান কয়েদি! সবারই গায়ে মস্ত কালো সতীত্ব বন্ধনী!  মিতা হক যা বলতে চেয়েছেন, তা  হল, নিজেদের   সংস্কৃতিকে সম্মান করো,    আরবের ধর্ম গ্রহণ করেছো, কিন্তু আরবের পোশাক-সংস্কৃতি তোমাকে গ্রহণ করতে হবে কেন!

 বোরখা ঠিক আরবের পোশাক নয়, বোরখা ইসলামের পোশাক। আরবে ইসলাম আসার আগে বোরখা বলে কিছু ছিল না। ইসলামকে নিরীহ বাঙালি  মুসলমানদের  মস্তিস্কের কোষে কোষে  এমন গভীরভাবে ঢুকিয়ে  দেওয়া হয়েছে যে গত দু'দশক ধরে  বাঙালি মুসলমান মেয়েরা  বোরখাকে নিজের পরিচয়ের অংশ বলে মনে করছে, অথবা মনে করতে  বাধ্য হচ্ছে।  ‘আমরা বৌদ্ধ, আমরা হিন্দু, আমরা খিস্টান, আমরা মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’— সত্তর  দশকে বাঙালিরা এই গানটা খুব গাইতো। এই  গান কেউ আর এখন  গায়  বলে মনে হয় না। এখন বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় মুসলমান পরিচয়। এই পরিচয়টি যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোরখার চল বাড়ে। দাড়ি টুপির প্রকোপ বাড়ে। তুমি মসজিদ মাদ্রাসা বানিয়ে  দেশ ছেয়ে ফেলবে, তুমি ইসলামি আইন রাখবে দেশে, তুমি সংবাধিনে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখবে, তুমি   ইসলামি মৌলবাদীদের রাজনীতি করতে দেবে, তাদেরকে সংসদে বসতে দেবে, তাদেরকে অবাধে  ওয়া্জ মাহফিল আর ইসলামি জলসা করতে দেবে,  তোমার চোখের সামনে ইসলামিকরণ হবে   দেশটার, আন্তর্জাতিক মৌলবাদী-সন্ত্রাসী চক্র কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাবে দেশের যুব সমাজকে নষ্ট করার জন্য, যুব সমাজ নষ্ট হতে থাকবে আর তুমি শাড়ি পরে  কপালে টিপ পরে  সাহিত্য সংস্কৃতির ছোট একটা শহুরে গোষ্ঠির মধ্যে ঘোরাঘুরি করে    রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে   স্বপ্ন দেখবে বাঙালির বাঙালি পরিচয়টা বড়   মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে,  তা কী হয়! এ তো রীতিমত জেগে ঘুমোনোর  মতো!  

মেয়েদের বোরখা পরার অর্থ হল, মেয়েরা  লোভের জিনিস, ভোগের বস্তু, মেয়েদের শরীরের কোনও অংশ  পুরুষের চোখে পড়লে পুরুষের   যৌন কামনা  আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে,  লোভ লালসার বন্যা নামে, ধর্ষণ না করে ঠিক শান্তি হয় না।     পুরুষদের এই যৌনসমস্যার কারণে  মেয়েদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হবে। এই হলো সপ্তম শতাব্দিতে জন্ম হওয়া ইসলামের বিধান। এই বিধান বলছে ,  পুরুষেরা সব অসভ্য, সব বদ,  সব যৌন কাতর,  ধর্ষক, তারা  নিজেদের যৌন ইচ্ছেকে দমন করতে জানে না, জানে না বলেই   শরীরের আপাদমস্তক ঢেকে রাখার দায়িত্ব  মেয়েদের নিতে হয়।  সত্যি কথা বলতে কী, বোরখা মেয়েদের যত অপমান করে, তার চেয়ে বেশি করে পুরুষদের।  বোরখার প্রতিবাদ পুরুষদেরই করা উচিত। অবাক হই, পুরুষেরা কী করে তাদের নিজেদের ধর্ষক পরিচয়টিকে টিকিয়ে রাখতে চায় মেয়েদের বোরখা পরার বিধানটি জারি রেখে! নিজেদের আত্মসম্মানবোধ বলে কিছুই কি নেই পুরুষের? তারা কেন এখনও বলছে না, ‘আমরা মেয়ে দেখলেই  ঝাঁপিয়ে পড়বো না, আমরা আমাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানি, আমরা বর্বর নই, আমরা অসভ্য অসংযত ধর্ষক  নই। আমরা শিক্ষিত, সভ্য। মেয়েরাও আমাদের মতো মানুষ। মেয়েদেরও তো যৌনইচ্ছে আছে, সে কারণে আমাদের তো বোরখা পরতে হয় না।  যদি মেয়েরা তাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানে, আমরা জানবো না কেন? আমরা জানি মেয়েদের সম্মান করতে। আমাদের দোহাই দিয়ে মেয়েদের বোরখার কারাগারে ঢুকিয়ে অত্যাচার করা আর চলবে না’।   


মিতা হকের আরব সংস্কৃতি নিয়ে বেশ রাগ। আরব সংস্কৃতি কেন বাংলায় এসেছে, এ প্রশ্ন অবান্তর। আরব  ,পারস্য, তুরস্ক, সমরখন্দ –এসব দেশ    থেকে মুসলমানরা ভারতবর্ষে  এসেছে, সঙ্গে ইসলাম এসেছে, দশম-একাদশ শতাব্দীতে  মুসলমান সুফিরা  বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। আমাদের হিন্দু পূর্বপুরুষ  ধর্মান্তরিত হয়েছেন নানা কারণে,   সুফিদের অমায়িক ব্যবহারে অথবা ব্রাহ্মণদের জাতপাতের  অত্যাচারে। কোনও ভাষা বা কোনও সংস্কৃতি মন্দ নয়, অসুন্দর নয়।  আমাদের নিজেদের ভাষা আর  সংস্কৃতিও  পৃথিবীর বিভিন্ন  ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেছে, মিশেছে। ভাষা আর  সংস্কৃতির বিবর্তন সবসময় ঘটছে, বাংলার মেয়েরা সবসময় এভাবে শাড়ি পরতো না, যেভাবে এখন   পরে।  বাঙালিরা  সবসময় ঠিক এই ভাষায় কথা বলতো না, যে ভাষায় আমরা এখন কথা বলছি বা লিখছি।  আমাদের ভাষার মধ্যে অন্য অনেক ভিনদেশি  শব্দ ঢুকেছে।  দরজা খোলা রাখাই ভালো, অন্য শব্দ, অন্য সুর, অন্য গল্প  ঢুকতে চাইলে ঢুকুক।  নিজের ভাষা আর সংস্কৃতি  এতে মরে যায় না, বরং সমৃদ্ধ হয়।   কিন্তু ক্ষতি হয় যখন কোনও ধর্ম তার মৌলবাদী চরিত্র নিয়ে ঢোকে।  কারণ মৌলবাদী ধর্ম মানবতার আর মানবাধিকারের ঘোর বিরোধী। 


ভারতবর্ষে যে সুফি ইসলামের প্রচার হয়েছিল, সেটির চরিত্র ছিল উদার।  সুফিরা নামাজ রোজায় বিশ্বাসী ছিলেন না।  বুলেহ শাহ নামের এক সুফি কবি তো মসজিদ মন্দির সব ভেঙে ফেলার কথা বলতেন। বলতেন, 'মসজিদ মন্দির ভেঙে ফেলো, হৃদয় ভেঙো না, হৃদয়ই সবচেয়ে বড় পবিত্র স্থান, কাবার চেয়েও পবিত্র'। সুফি ইসলামকে সরিয়ে মৌলবাদী ইসলাম  গেড়ে বসলো  ভারতবর্ষে,  সম্ভবত  তিরিশ চল্লিশের দশকেই,  গোটা পৃথিবীকেই দখল করার জিহাদি স্বপ্ন নিয়ে তখন  মাওলানা মওদুদি বানিয়ে  ফেললেন  তাঁর জামাতে ইসলামি দল। ভারত ভাগের পর ভৌগলিক সুবিধের কারণে অত দ্রুত মৌলবাদী ইসলাম  এসে নষ্ট করতে পারেনি  হিন্দু বৌদ্ধ বেষ্ঠিত   পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের।  পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকের দুঃশাসন  থেকেও  পূর্ব পাকিস্তান ব্যস্ত ছিল নিজেদের বাঁচাতে। সুফি ইসলামের তখনও রেশ ছিল বলে মুসলমানিত্বের চেয়ে বাঙালিত্ব বড় ছিল বাঙালি মুসলমানদের কাছে। একাত্তরের পর যখন সেনাবাহিনীর লোকেরা শাসন করতে শুরু করলো দেশ, মৌলবাদী ইসলামকে তারা বেশ সোহাগ করে  বড় আসন পেতে দিল বসতে, ননীটা ছানাটা খাইয়ে নাদুস নুদুস করলো,  আর সত্যিকার নষ্ট হতে থাকলো তখন  দেশ। মৌলবাদী  ইসলামে দেশ ছেয়ে গেলে বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে মুসলমান পরিচয়, বাংলা ভাষার চেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে আরবী ভাষা, হৃদয়ের চেয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে মক্কা মদিনা। আমি মনে করি না ভালোবেসে কেউ তখন আরবীয় সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করে। ভয়ে গ্রহণ করে, আল্লাহর ভয়ে, দোযখের ভয়ে। ইসলামের জন্মভূমির সব কিছুকে অনুকরণ করে দোযখের আগুন থেকে যদি  বাঁচা যায়, চেষ্টা করে। মানুষ তখন বিভ্রান্ত। একগাদা রূপকথাকে সত্যি বলে ভেবে নিলে অপ্রকৃতস্থের মতো  আচরণ তো করবেই। দোকানপাটে তো ঝুলবেই শত শত রেডিমেইড বোরখা।   কালো কাপড়ে ঢেকে  দেওয়া হবে  মেয়েদের নাম পরিচয়, মেয়েদের অস্তিত্ব। মেয়েরা তখন শুধু  জম্বি, ওয়াকিং ডেড, ফেসলেস।  শুধুই 'নো-বডি', কেউ নয়। দুঃখ এই,  এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও মেয়েরা হারিয়ে ফেলছে যে বোরখা তাদের 'কেউ' থেকে 'কেউ নয়' বানিয়ে ফেলে।  


বোরখার বিরুদ্ধে    বলেছেন বলে  মিতা হককে নাকি লোকেরা খুব গালি গালাজ করছে। যে পুরুষগুলো    বলে বোরখা খুব ভালো পোশাক, সুন্দর পোশাক, চমৎকার পোশাক, ওই পুরুষগুলো কেন বোরখা পরছে না কেউ জিজ্ঞেস করেছে? কেউ কেন  ওদের জিজ্ঞেস করছে না, ‘বোরখা যদি অত ভালো পোশাক, তাহলো তোরা বোরখা পরছিস না কেন? দু'দিন ভালো পোশাকটা  প'রে দেখ না  কেমন ভালো  লাগে!’ ?  

  ব্যক্তিগত কিছু ঈর্ষা-জনিত কারণে তাঁর স্ত্রীদের জন্য  বোরখার প্রচলন শুরু করেছিলেন পয়গম্বর। বেশ ছিল। হঠাৎ কী মনে হল কে জানে,  বলে দিলেন সব মুসলমান মেয়েকেই এখন বোরখা পরতে হবে।   চৌদ্দশ বছর আগে যে কারণেই মুসলমানদের মধ্যে বোরখার চল শুরু হোক না কেন, এখন এই একবিংশ শতাব্দিতে মেয়েদের বোরখা পরার  পেছনে কোনও যুক্তি নেই। সত্যি বলতে কী, বোরখা   মেয়েদের কাজে লাগে না, লাগে পুরুষের কাজে। বোরখা আসলে পুরুষের পোশাক,  চোর ডাকাত খুনী পুরুষের পোশাক। পুরুষেরা যখন চুরি ডাকাতি করে, খুন করে, বোরখা পরে নেয়। এতে ওদের  সুবিধে হয় বেশ,  কেউ চিনতে পারে না।  চোর ডাকাতের পোশাককে ধর্মের নামে মেয়েদের গায়ে চাপানোর কোনও মানে হয়? 

শেষ চুম্বন




ধরা যাক মেয়েটির নাম মেয়ে আর  ছেলেটির নাম ছেলে।
সেই যে কোত্থেকে উড়ে এসে ছেলেটি হঠাৎ চুমু খেয়েছিল,
হঠাৎ মেয়েটিকে অবাক করে অবশ করে,
কোনও প্রেম ছাড়া,  কাল দেখা হচ্ছে বা পরশু আসছি ছাড়া,
সেই যে গভীর করে চুমু খেয়েছিল, সেই যে চুরমার করে, টুকরো টুকরো করে,
সেই যে ভেঙে, ছিড়ে,
এক ঘর আলোয়, 
সেই যে মেয়েটিকে আচমকা ডুবিয়ে ভাসিয়ে  চুমু খেয়েছিল,
ছেলেটির তারপর থেকে দেখা নেই আর। 

মেয়েটি জানে না ছেলেটি কে, কোথায় বাড়ি,  শুধু চোখদুটো দেখেছিল,
চোখদুটোয়  দুটো মার্বেল ছিল, যেন ছোটবেলার খেলার মাঠে পড়ে থাকা দুটো ঝকঝকে মার্বেল, 
এত হুড়মুড় করে কৈশোর আসেনি দীর্ঘদিন,  
কারও চোখের চাওয়ায়   উতল হাওয়াও এত ছিল না কোনওদিন..
হঠাৎ চমকে উঠে মেয়েটি বলে, ছেলেটি কি সেই ছেলে?
নিজেকেই তারপর বারবার বলে,  ছেলেটি তো সেই ছেলে যে ছেলে ঘুরন্ত লাটিম এনে হাতের  তালুতে দিত প্রতিদিন! যতক্ষণ লাটিম ঘুরতো তালুতে,  মনে হতো পুরো জগত তার  হাতের মুঠোয়। 
মেয়েটির   শিরশির করতো শরীর, ছেলেটি মুগ্ধ চোখে দেখতো, খেলার মাঠে পড়ে থাকা 
মার্বেলদুটো থেকে আলো ছিটকে এসে পড়তো সেই চোখে, 
দুটো মার্বেল চোখ ছিল সেই মুগ্ধ চোখে। 


ছেলেটি তবে কি সেই খেলার মাঠের ছেলে, এই চুমু খাওয়া ছেলে?
ছেলেটি তবে কি ঘুরন্ত লাটিম ছেলে? এই হঠাৎ আচমকা চুমু খাওয়া ছেলে?
কোনওদিন আবার আসবে কি না সে, আবার চুমু খাবে না কি না, মেয়েটি জানে না
মেয়েটি জানেনা, সে রাতে আর কোথাও চুমু খাওয়ার কেউ ছিল না বলে 
ছেলেটি চুমু খেয়েছিল, হাতের কাছে যাকে পেয়েছিল  খেয়েছিল,
ঝড়বৃষ্টির রাতে, নির্জন রাতে, সাত পাঁচ না ভেবেই খেয়েছিল।
পরদিন  নেশা   কেটে গেলে ছেলেটি ভুলেও গেছে খেয়েছিল



মেয়েটির স্বামী এসে সপ্তাহান্তের  সঙ্গম সেরে যায়, স্বামী চুমু খেতে গেলে মুখ ঠোঁট সরিয়ে নেয় মেয়ে, এই শরীর দিচ্ছি নাও, সঙ্গমে সারাদিন মেতে থাকো, সারারাত থাকো, চুল থেকে পায়ের নখ অবধি চাখো চোষো,  শুধু চুমুটা খেও না।   

শেষ চুম্বনের স্মৃতি টুকু বাঁচিয়ে রাখে মেয়ে।


ওই চুমু তার হাতের মুঠোয় গোটা একটা জগত দেয়।
ওই চুমু তাকে এক ঝাঁক কৈশোর দেয়,
ছেলেটির চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে ছেলেটির চুম্বন,
চুম্বনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে মেয়েটির কৈশোর।
কৈশোরের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে কৈশোরের স্বপ্ন।
স্বপ্নগুলো হিরের মতো,  ঠিকরে বেরোতে থাকে আলো। সেই আলোয় ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে
মার্বেল চোখের ছেলে, তার প্রতিরাতের নেশা, তার যাকে তাকে চুমু খাওয়া,
তার ভুলে যাওয়া, তার না আসা। 



Thursday, 15 August 2013

সাদামাটা সাক্ষাৎকার



হিন্দি সাহিত্য পত্রিকা হানসে আমি লিখি। কিছুদিন আগে হানস থেকে আমার একটি সাক্ষাৎকার চাওয়া হয়েছে। প্রশ্নোত্তরগুলো এরকম।

প্রশ্ন ১: শাহবাগ আন্দোলন, তারপর এখন যে জামাতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করার হাইকোর্টের রায়—কী মনে হয় আপনার, এটা কি জনগণের মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছে, রাজনৈতিক বদল দেখা দিচ্ছে?

উত্তর: খুব ভালো একটা রায়। তবে এই রায়ের কারণে যে বাংলাদেশ একটা ধর্মীয় রাষ্ট্র থেকে এক তুড়িতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে যাবে, তা নয় কিন্তু। গত  তিন দশক থেকে যে ইসলামিকরণ চলছে দেশে, তা এক রায়ে পিছু হঠবে না।  ইসলাম আনা  খুব সহজ, কিন্তু ইসলামকে দূর করা সহজ নয়। এ অনেকটা দুষ্ট  ভাইরাসের মতো, একবার চলে এলো তো গভীর   শেকড় গেড়ে বসবে। জামাতি ইসলামির ওপর ধর্ম-নিরপেক্ষ অনেক মানুষেরই  রাগ ছিল। কারণ এই দলটি   ক্ষমতা পেলে  ইসলামি শরিয়া আইন এনে দেশের সর্বনাশ করবে, মেয়েদের পাথর ছুড়ে মারবে, মুক্তচিন্তার লোকদের ধরে ধরে জবাই করবে।   বর্তমান সরকারেরও একটা ভয়, এই দলটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রধান বিরোধী দল ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, যেহেতু এ ঘটনা আগে অনেকবার ঘটেছে, তাই এ দলটিকে নিষিদ্ধ করার  দাবি যখন জনতা তুলেছে, এবং তারাই তুলেছে, যারা আওয়ামী লীগকে ভোটে জিতিয়েছে, তাদেরও শান্ত করা গেলো. বিরোধী দলকেও আপাতত নিরস্ত্র করা গেলো। এখন নির্বাচনে জিততে হলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চালাতে হবে বিএনপির, জামাতকে বগলে নিয়ে বগল বাজিয়ে জিতে যাওয়ার আরামটা বন্ধ হবে। এইসব রাজনীতি সম্ভবত ছিল জামাতি ইসলামকে নিষিদ্ধ করার পেছনে। বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্র থেকে   আলাদা হলেও  অনেকটাই প্রভাবিত। 

সব কিছুর পরও একটা ধর্ম-আক্রান্ত দেশে  ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে, এর চেয়ে বড়  সুখবর আর কিছু নেই। এরপর মৌলবাদকে মানুষ কতটা প্রশ্রয় দেবে, সমাজের ওপর এর প্রভাব কতটুকু হবে, সবই নির্ভর করে দেশের মানুষের ওপর।



প্রশ্ন২: আশা দেখতে পাচ্ছেন দেশে ফেরার?

উত্তর: আজ কুড়ি বছর নির্বাসন জীবন যাপন করছি। আওয়ামি লীগকে লোকে সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ দল বলে।  এই আওয়ামি লীগ যখন ক্ষমতায় এলো, অনেকে ভেবেছিল, এবার আমি দেশে ফিরতে পারবো। কিন্তু আওয়ামি লীগও বিএনপির মতোই আচরণ করেছে। আসলে আমি লক্ষ্য করেছি,  আমার বেলায় সব রাজনৈতিক দলই একই ভূমিকা পালন করে। সকলেই আমার ঢোকার দরজায় তালা দিয়ে রাখে। নিজেরা চুলোচুলি করলেও আমার বেলায় সবাই হাতে হাত মেলায়। আমাকে আমার দেশে ঢুকতে না দেওয়ার  কী কারণ, তা কোনও সরকারই আমাকে জানায়নি।
আমার ধারণা, আমাকে দেশে ঢুকতে দিলে  মৌলবাদীরা যদি সরকারকে দোষ দেয়, দুটো ভোট যদি আবার নষ্ট হয়ে যায়,  সে কারণে কেউ ঝুঁকি নেয় না। ন্যায়ের পক্ষে বা সত্যের পক্ষে  রাজনীতিবিদরা খুব একটা   দাঁড়ায় না। আমাকে পক্ষে কথা বললে কারও যেহেতু রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি হয় না, যেহেতু আমাকে তাড়িয়ে দিলে দেশের লোকেরা খুব বেশি প্রতিবাদ করে না, যেহেতু বছরের পর বছর আমাকে দেশে না ঢুকতে দিলেও   সবাই নীরব থাকে,  যেহেতু   কোনও দল নেই, সংগঠন নেই  আমাকে সমর্থন করার, সেহেতু আমার জন্য দরজা খোলার, কোনও সরকারই মনে করে না যে  দরকার। 
আমি সত্যি বলতে কী আশা ছেড়েই দিয়েছি।




প্রশ্ন ৩. ২০০৭ সালে আপনাকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। তারপর অনেক চেষ্টা করেছেন কলকাতা ফেরার, তা কিন্তু সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার বদলেছে, এবং তারা পরিবর্তনের কথা বলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আপনি কি মনে করেন আপনি কলকাতা ফিরে যেতে পারবেন? আপনি নতুন সরকারের কাছে আবেদন করেছেন কি?

উত্তর:   অনেক চেষ্টা করেছি কলকাতায় ফেরার। নতুন সরকারের কাছেও আবেদন করেছি। কিন্তু ওঁরা  রাজি নন। সিপিএমের সঙ্গে সমস্ত বিষয়ে তৃণমূল দ্বিমত পোষণ করলেও আমার বিষয়ে একমত। এ ক্ষেত্রে দুজনের অংকটা একদম মিলে যায়।  এখন আমি  হাল ছেড়ে দিয়েছি।  সত্যি কথা বলতে কী, বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য দেখি না। দুটো অঞ্চল থেকেই   একজন  লেখককে অন্যায় ভাবে তাড়ানো হয়েছে, শুধু তাই নয়, তার আর ফিরতে না পারার ব্যবস্থাও পাকাপাকি করে রাখা হয়েছে। বড় লজ্জা হয় ওঁদের জন্য। বড়ই ক্ষুদ্র মানুষ ওঁরা। দূরদৃষ্টি তো নেই-ই, দুষ্টবুদ্ধিতে মাথাটা ভরে রেখেছে।

প্রশ্ন ৪. এশিয়ার বাইরে  আপনার সমর্থনে এত বিদ্বান, এত সাহিত্যিক সামাজিক কর্মী এবং জন-সমগ্র এগিয়ে এসেছেন  কিন্তু এখন পর্যন্ত   এশিয়া মহাদেশে একটিও সামাজিক সামগ্রিক আওয়াজ উঠলো না কেন আপনার পক্ষে? 
উত্তর: এশিয়া এখনও প্রস্তুত নয় আমি যে কথাগুলো বলছি, সেগুলো মেনে নিতে। এশিয়া এখনও ঘোর পুরুষতান্ত্রিক, এখনও ধর্মান্ধ। তবে রাষ্ট্র বা  কোনও হোমড়া চোমড়া কিছু সংগঠন দ্বারা স্বীকৃতি না পেলেও এশিয়ায় সাধারণ পাঠকদের প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি। যারা ভালোবাসে, সমর্থন করে, সম্ভবত তারা সংগঠিত নয় বলেই বড় আওয়াজ ওঠে না। না, আমি অসন্তুষ্ট নই। কী   পাইনি ভেবে দুঃখ করার চেয়ে কী পেয়েছি তা ভেবে  খুশি থাকায় বিশ্বাসী আমি। 


প্রশ্ন ৫. আপনি যা কিছু করেছেন, তা ছাড়াও সাম্প্রতিকালে মালালা, আমিনা ওদুদ,বিনা শাহ এবং আরও অনেক আওয়াজ উঠেছে ধার্মিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, আওয়াজ উঠেছে পরিবর্তনের, বিশেষত মুসলমান মহিলাদের জন্য। এখান থেকে দশ কুড়ি বছর যদি এগিয়ে যান, তবে কি পরিবর্তন দেখতে পান, মুসলমান মহিলাদের জীবনে কি প্রগতি দেখতে পান?

উত্তর:  দশ বা কুড়ি বছরে খুব যে পরিবর্তন দেখতে পাবো, তা মনে হয় না। মুসলিম দেশগুলোতে এখনও ইসলামি মৌলবাদি গোষ্ঠি প্রচণ্ড শক্তিশালী। ব্যক্তিগত ভাবে কেউ কেউ প্রতিবাদ করছে বটে, তবে এ প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ না রাষ্ট্রশক্তি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, নারী-সংগঠন   একযোগে মুসলিম মেয়েদের সমানাধিকারের ব্যবস্থা  না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার প্রগতির কিছু ঘটবে না। সত্যিকার  প্রগতি চাইলে রাষ্ট্র থেকে, সমাজ থেকে, শিক্ষা থেকে, আইন থেকে  ধর্মকে দূর করতে হবে। ধর্মও থাকবে, নারী স্বাধীনতাও থাকবে, এ মূর্খের কল্পনা বিলাস। ধর্ম যেহেতু নারীর স্বাধীনতা এবং অধিকারের বিপক্ষে, তাই ধর্মকে, ধর্মের বৈষম্যকে, ধর্মের আইনকে  মাথার ওপরে অক্ষত অবস্থায় রেখে নারীর সমানাধিকার সম্ভব নয়। আমি কিন্তু সব ধর্মের কথাই বলছি।    আর সব নারী-বিদ্বেষী ধর্মের মতোই ইসলাম একটি নারী বিদ্বেষী  ধর্ম। কেবল ইসলামই মন্দ, অন্য সব ধর্ম ভালো, এই উদ্ভট ভাবনা আমার নয়।   
এতকালের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে যে ভীষণ রকম নারী-বিদ্বেষ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে, তা দূর করার জন্য শুভ বুদ্ধির সব মানুষকে কাজ করতে হবে। অন্যরা সমাজ বদলে দেবে, তারপর আমি ভোগ করবো, এটা  ভেবে বসে থাকলে সমাজের বদল ঘটতে বড় দেরি হয়ে যায়।  আমাদের জগত। আমাদের সময়। আমাদের সমাজ। আমাদের  জীবন। আমাদের সবারই দায়িত্ব একে সুন্দর করা। প্রজাতির অর্ধেককে নিগ্রহ করবো আর নিজেদের   শ্রেষ্ঠ প্রজাতি আখ্যা দেবো—এর চেয়ে হাস্যকর এবং দুঃখজনক ব্যাপার আর কী আছে!    


 প্রশ্ন ৬: এই উপমহাদেশে যেখানে  ধর্ম আর রাজনীতি একই শরীরের দুটো হাত, একে অন্যের সঙ্গে জড়ানো। সেই অর্থে আপনি একটি আঘাতে দুবার বিধ্বস্ত হয়েছেন। আপনি ছাড়াও আরও অনেকে সেই আঘাতের শিকার। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য? 
উত্তর: ধর্ম আর রাজনীতিকে মেশালে ধর্মও নষ্ট হয়, রাজনীতিও নষ্ট হয়। এ দুটোর আলাদা থাকাটা খুবই জরুরি। যে মানুষেরা বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে আলস্য বোধ করে, অথবা বিজ্ঞানকে জানতে গিয়ে দেখেছে রীতিমত কঠিন ব্যাপার এটি, তারা ধর্মে আশ্রয় নেয়, ধর্মে আরাম বোধ করে, যেহেতু ধর্মই সবকিছুর সহজ এবং চমৎকার সমাধান দেয়, ধর্ম সম্পর্কে জানতে কোনও  বুদ্ধি খাটাতে হয় না, গভীরভাবে ভাবতে হয় না, কোনও প্রশ্ন করারও দরকার হয় না।  যারা ধর্মের মতো অবিজ্ঞান আর নারীবিদ্বেষের একটা পিণ্ডের ভেতর নিজেকে পুরে সুখী হতে চায় হোক। কিন্তু দেশের রাজনীতি এই অবিজ্ঞান আর নারীবিদ্বেষের পিণ্ডের   সঙ্গে ভাই পাতাবে কেন? এ দুটো ভাই পাতালে  মানুষের মস্তিস্ক নষ্ট হয়,  পরিবার নষ্ট হয়,  সমাজ নষ্ট হয়, দেশ নষ্ট হয়। সব নষ্টদের দখলে চলে যায়। রাজনীতির কাজ দেশের মানুষের দেখভাল করা। ঠিক ঠাক রাজনীতিটা হলে   মানুষ সুখে স্বস্তিতে থাকে, অভাব, অনটন দূর হয়, সবার জন্য শিক্ষা স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা হয়, কাজকর্মের সুযোগ ভালো হয়, দূর্নীতি বদনীতির প্রকোপটা কমে যায়। রাজনীতির মধ্যে ধর্মের ছিটে ফোটা ঢুকলেই সর্বনাশ। এ দুটোকে আলাদা করতে গিয়েই দেখেছি আমাকে প্রচণ্ড আঘাত করা হচ্ছে।। শুধু আমি নই, আরও অনেকেই শিকার হয়েছে এই বীভৎস ধর্মরাজনীতির। ধর্মনির্ভর রাজনীতি সব দেশেই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এর একটিই কারণ, ধর্মের সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারীর অধিকার, বাক স্বাধীনতা এসব যায় না। ধর্মের সঙ্গে চিরকালই এসবের বিরোধ।
রাষ্ট্র এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা না করা হলে  মানুষের  দুর্ভোগের কখনও শেষ হবে না। সৎ এবং সাহসী মানুষদের খুন হয়ে যেতে হবে, পচতে হবে জেলে, নয়তো আমার মতো নির্বাসনে জীবন কাটাতে হবে। 



প্রশ্ন ৭: এডওয়ার্ড স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়নি ভারত। আপনার কি মনে হয় রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া ভারতের উচিত ছিল?

উত্তর: প্রথমেই বলতে হবে, আমেরিকার উচিত হয়নি স্নোডেনকে ভোগানো। কী অন্যায়  করেছে সে, ভেতরের লুকোনো খবরগুলো  জানিয়ে দিয়েছে, এই তো? আমি খুব খুশি হতাম যদি স্নোডেন আমেরেকায় বসে এই কাজটা করতো এবং   আমেরিকার সরকার তাকে  কোনওরকম বিরক্ত না করতো।  ইওরোপ যে এত মানবাধিকারের জন্য  প্রাণপাত করছে, ইওরোপ, বিশেষ করে পশ্চিম ইওরোপ  স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে না কেন! ভারতের  কথা উঠছে কেন! ভারত দিতেই পারে তাকে আশ্রয়। কিন্তু ভারত হয়তো ভাবছে এসময়   আমেরিকার সঙ্গে শত্রুতা করা   উচিত হবে না। ভারতের    একশ রকম সমস্যা।  এক ডজন মুসলিম মৌলবাদী রাস্তায় নেমে  খানিকটা চেঁচালেই ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় আশ্রিত লেখককে রাজ্য থেকে বা  দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবার, সেখানে কী করে ভাববো স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে  আমেরিকার মতো ভয়ংকর   শক্তির বিরুদ্ধে ভারত দাঁড়াবে!  
সারা পৃথিবী যখন স্নোডেনকে আশ্রয় দিতে পারছিল না, তখন ভারত যদি দিতে পারতো, তাহলে শুধু আমি কেন, ভারত নিয়ে   গৌরব করতে পারতো  পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ।  যা হয়নি, হয়নি। আপাতত স্নোডেন নিরাপদে রাশিয়ায়।
আমি যে অবস্থাটির স্বপ্ন দেখি, সেটি বিপদগ্রস্থ লেখক শিল্পীকে ভালো ভালো দেশগুলোর রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া  নয়। আমি স্বপ্ন দেখি, কোনও দেশে  যেন এমন অবস্থার সৃষ্টি না হয়, যে, দেশের লেখক শিল্পীকে বেরিয়ে যেতে হয় দেশ থেকে, বেরিয়ে  অন্য কোনও দেশে আশ্রয় চাইতে হয়। সবখানেই যেন মানুষের মত প্রকাশের অধিকার থাকে।    সব অঞ্চলই, সব দেশই, পৃথিবীর সর্বত্রই  যেন  মানুষের জন্য নিরাপদ হয়।  


প্রশ্ন ৮. এ বছর বেলজিয়ামে রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব আর্টস, সায়েন্স, এবং লিটারেচার থেকে পাওয়া অ্যাকাডেমি পুরস্কার ছাড়াও প্যারিস থেকে ইউনিভার্সাল সিটিজেনশিপ পাসপোর্ট পেয়েছেন। এই পাসপোর্টটা ঠিক কি রকম পাসপোর্ট? আপনার পাওয়া পুরস্কারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট কোনটি?

উত্তর: ইউনিভার্সাল সিটিজেনশিপ পাসপোর্ট অনেকটা প্রতিকী পাসপোর্ট। এই পাসপোর্টটা সভ্য মানুষদের  পাসপোর্ট, ভবিষ্যতের পাসপোর্ট। এই  পাসপোর্টে কিন্তু  নিজের জেন্ডার, জাত, ধর্ম, চোখের রং, চুলের রং, গায়ের রং, দেশ এসবের উল্লেখ নেই। শুধু নিজের নাম আর বয়সটুকুই। এই পাসপোর্টে কোনও ভিসার প্রয়োজন নেই। এই পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর সব দেশেই ভ্রমণ করা যাবে। শুধু ভ্রমণ নয়, যে দেশেই বা যে অঞ্চলেই বাস করতে চাও, সেখানে বাস করতে পারবে। বাধা দেওয়ার অসভ্য নিয়ম টিয়ম নেই। এ অনেকটা স্বপ্নের মতো। এই স্বপ্ন কোনওদিন হয়তো সত্যি হবে। কিন্তু আজ আমরা একটা স্বপ্ন তৈরি করলাম।  যারা সুন্দরতম একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে, তাদেরই দেওয়া হয়েছে এই পাসপোর্ট। 
জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের ভালোবাসা। আমার বই পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়েরা  যখন ভালোবাসেন, বলেন, আমার বই তাঁদের শক্তি সাহস বাড়ায়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, তখন বড় ভালো লাগে। এর চেয়ে বড় পুরস্কার একজন লেখকের আর কী থাকতে পারে! 


প্রশ্ন ৯: বিগত দু মাসে আপনি কানাডা আর আয়ারল্যাণ্ডে অ্যাথিস্ট হিউম্যানিস্ট কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলেন। এরা বিশেষ কোনও সংগঠন? এদের প্রধান উদ্দেশ্য কি?

উত্তর: সারা পৃথিবীতেই বিজ্ঞানমনস্ক, ধর্মমুক্ত, যুক্তি বুদ্ধি সম্পন্ন,  মুক্তচিন্তার মানুষ আছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই  সংগঠন গড়েছেন। এই সংগঠনগুলো থেকে  মাঝে মাঝেই  সেমিনার আর কনভেনশনের আয়োজন করা হয়, যেখানে মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সৃষ্টিশীল চিন্তক লেখক, শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।  যে ভাবনাগুলো রক্ষণশীল সমাজ মেনে নেয় না, সেই ভাবনাগুলো  সকলে ওইসব সেমিনার আর কনভেনশনে  নিশ্চিন্তে  প্রকাশ করেন, আগ্রহী  বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ   বিদ্বৎজনের বক্তব্য শুনতে আসেন। বোদ্ধা শ্রোতা আর বক্তার মধ্যে মতের আদান প্রদান হয়।   সাধারণ মানুষকে    বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহী করার, বিবর্তনের জ্ঞান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রচার মাধ্যম থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার এসবের প্রতিবাদ করার   প্রেরণা দেওয়া হয়।  শুধু তাই নয়, মানবাধিকার, নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার   সমকামী বা  রূপান্তরকামীর অধিকারের পক্ষেও  আমরা  উচ্চকণ্ঠ কই।  গণতন্ত্র, মানবতন্ত্র, আর বৈষম্যহীন  সমাজের প্রতিষ্ঠার জন্য যা করা দরকার, সকলে মিলে তার  পরিকল্পনা করি।   মূলত আমাদের স্বপ্ন, একটি সুস্থ সুন্দর   পৃথিবী তৈরি করা, যেখানে ধর্মের, পুরুষতন্ত্রের, শোষক শ্রেণীর অত্যাচার নেই।  


প্রশ্ন ১০: আপনি দীর্ঘদিন ধরে বাক স্বাধীনতার পক্ষে এবং সাহিত্যিক প্রতিবন্ধনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এ বছর ৩১ জুলাই হানস পত্রিকা তাদের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে আপনাকে আমন্ত্রণ করেছিল। এই অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য যা ছিল, তা নিয়েই আপনার লড়াই। তাহলে সম্ভব হলো না কেন?

উত্তর: ভারতের হায়দারাবাদে   বই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা আক্রমণ করার পর থেকে     একটি অলিখিত চুক্তিই আমার ভারতবর্ষের সঙ্গে,  জনতার ভিড়ে কোনও অনুষ্ঠান টনুষ্ঠানের মঞ্চে আমি উঠবো না।   আমি তো ভীষণ চাই মানুষের মধ্যে থাকতে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, মত বিনিময় করতে। কিন্তু আপাতত এটি সম্ভব নয়। আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের পরামর্শ আমাকে মানতে হয়। সে কারণেই আমি হানসের অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি।  আমি শুনেছি ওখানে  অনেকে গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে দেখা হবে এই আশায়।  কিন্তু আমি খুবই দুঃখিত   সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি বলে।
বাক স্বাধীনতা নিয়ে আমার লড়াই। হানসের অনুষ্ঠানে না যাওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আমি বাক স্বাধীনতাকে মূল্য দিইনি। জীবনের নিরাপত্তার কারণে কোনও জায়গায় শারীরিক ভাবে উপস্থিত না থাকার অর্থ বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। আমি আমার বাক স্বাধীনতা কী রকম রক্ষা করছি এবং অন্য সবার বাক স্বাধীনতার কতটা পক্ষে আমি, তা আমার বই এবং ব্লগগুলো পড়লেই যে কেউ বুঝবে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সেসব মত আমি প্রকাশ করছি। কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষীদের  বাধা যেখানে আছে, সেখানে আমার অনুপস্থিতির জন্য আমাকে    দোষ দেওয়া ঠিক নয়।

আমি আশা করছি, আমি বেঁচে থাকাকালীন সেই দিন  যেন আসে, যে দিন   ভারতবর্ষের কোথাও যেতে কোনও বাধা থাকবে না আমার।  জনতার ভিড়ে  আর সবার মতো আমিও আমার পরিচয়ে হাঁটতে    পারবো। কোনও নিরাপত্তা রক্ষীর প্রয়োজন হবে না।  মানুষের ভালোবাসাই হবে আমার নিরাপত্তা। সেই দিন  যেন আসে,    যতই ধর্মের সমালোচনা  করি না কেন, কেউ মাথার দাম ঘোষণা করবে না, কেউ হত্যা করতে আসবে না, কেউ ফতোয়া দেবে না।  আমিও একদিন কবিতা পড়তে পারবো আর সব কবিদের মতো, আমিও বইমেলায় অটোগ্রাফ দিতে পারবো আর সব লেখকদের মতো, আমিও সাহিত্য সংস্কৃতির পরবে  অনুষ্ঠানে আমার মত প্রকাশ করতে পারবো, নির্ভয়ে, নিরাপদে।  




প্রশ্ন ১১: হানস পত্রিকা বিগত দেড় বছর যাবৎ আপনার লেখার হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করছে। এই পত্রিকার সম্পাদকের প্রচেষ্টাকে কিভাবে স্বাগত জানাবেন?

উত্তর: আমি খুবই কৃতজ্ঞ রাজেন্দ্র যাদবের কাছে। ভারতবর্ষে  যেদিন আমার বই নিষিদ্ধ হল, সেদিন থেকেই পাল্টে গেছে   পুরো পরিবেশ। আমার বই প্রকাশ করতে   প্রকাশকরা     ভয় পান, আমার লেখা ছাপাতে সম্পাদকরা ভয় পান, সরকার আমার বিরুদ্ধে-- এই খবরটি  মুসলিম মৌলবাদীদের এমনই ইন্ধন যোগালো যে   দলে দলে  তারা আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে শুরু করলো, পথে নামতে শুরু করলো,   দেশ থেকে আমাকে তাড়ানোর দাবিও করতে লাগলো। যদি পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমার বইটি নিষিদ্ধ না করতো, তা হলে ফতোয়া, মাথার দাম ইত্যাদি কিছুই জারি হতো না। সবচেয়ে বড় দুঃখ এই, বই নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব কিন্তু মৌলবাদীদের কাছ থেকে আসেনি। কলকাতার কিছু ঈর্ষাকাতর লেখক সাহিত্যিকের কাছ থেকে এসেছে।  সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল লেখকেদের দাবির কারণে। সরকার যখন কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এই ছুতোয় বই নিষিদ্ধ করে, তখন তাদের  ধর্মীয় অনুভূতিকে সরকারই  হাজার গুণ উসকে দেয়, আর  সেই ধর্মের মৌলবাদীদের হাতেই অস্ত্র তুলে দেয় বইয়ের লেখককে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করার জন্য, তাকে হয়রানি করার জন্য, পেটানোর জন্য,  হত্যা করার জন্য। 
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এই ছুতোয় সরকার কোনও লেখকের বই নিষিদ্ধ করলে বইয়ের প্রকাশক, পত্রিকার সম্পাদক, এমনকী পাঠকও সরকার এবং মৌলবাদীদের ভয়ে তটস্থ থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনও ঠিক জানে না  বাক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা।  

হানস পত্রিকার নীতির প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। রাজেন্দ্র যাদবের মতো  সাহসী এবং সৎ লেখকের অভাব খুব সমাজে।


    
প্রশ্ন ১২: হিন্দিতে অনুবাদ করা আপনার সাম্প্রদিক বই কতদিনে আশা করবো? বইটি কি নিয়ে?
উত্তর: যে বইটি বের হতে যাচ্ছে, সেটির নাম নির্বাসন। কী করে আমি  প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, তারপর ভারতবর্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম, তারই কাহিনী। নির্বাসন  আমার আত্মজীবনীর সপ্তম খণ্ড। আমি তো সাত খণ্ডে রামায়নের মতো আমার আত্মজীবনী লিখলাম। প্রথম খণ্ডটির নাম  'আমার মেয়েবেলা',  ওটি ‘আনন্দ পুরস্কার’ নামে বাংলা সাহিত্যের খুব বড় একটা পুরস্কার পেয়েছে।  বইগুলোর  সব খণ্ডই অনেক ভাষায় ছাপা হয়েছে। লোকে গোগ্রাসে পড়ে আত্মজীবনীগুলো। এসব তো কেবল আমার জীবনকাহিনীই নয়, আরো হাজারো মেয়ের জীবন কাহিনী।  তৃতীয় খণ্ডটি 'দ্বিখণ্ডিত', যেটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কলকাতার একটি  মানবাধিকার সংগঠন  থেকে কিছু লোক দ্বিখণ্ডিত    নিষেধাজ্ঞার  বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।  কলকাতা হাইকোর্ট নিষিদ্ধ হওয়ার মতো  কিচ্ছু পায়নি বইটিতে। নির্দ্বিধায় মুক্ত করে দিয়েছে। নিষিদ্ধ হওয়ার দু’বছর পর মুক্তি পেয়েছে বই।   জনতা নিষিদ্ধ করে না বই। শাসকেরা করে। দুষ্ট লোকদের দুষ্ট বুদ্ধিতে চিরকালই তারা বই নিষিদ্ধ করে আসছে। বই নিষিদ্ধ বড়ই নোংরা কাজ। বাংলাদেশের সরকার নোংরা কাজে রীতিমত হাত পাকিয়েছে। আমার পাঁচটা বই নিষিদ্ধ ও দেশে। দেশের মানুষগুলোও নোংরা, কেউ এ পর্যন্ত নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে ও দেশে মামলা করেনি। 


প্রশ্ন ১৩: এই শহরটাকে আপনার কেমন লাগে? কখনও কি মনে হয় এটাও আপনার ঘর? কী করতে  আপনার সবচেয়ে ভালো লাগে?

উত্তর: কোনও জায়গা জমি, দেশ, বাড়ি আমার ঘর নয়। আমার ঘর মানুষ, মানুষের হৃদয়। পৃথিবীর যেখানেই যে মানুষেরা  স্বপ্ন দেখে সুন্দরের, সত্যের, যাদের সহমর্মিতা,  সমর্থন, , শ্রদ্ধা পাই, ভালোবাসা পাই , সেই মানুষেরাই আমার ঘর, আমার বাড়ি।    সেই মানুষের হৃদয়ই   আমার নিরাপদ স্বদেশ।  


প্রশ্ন ১৪: আপনি কি ভবিষ্যতে গৃহস্থ জীবনে নিজেকে সেটেল করার কথা ভাবেন?

উত্তর: আমার যে জীবন, সে জীবন কি অগৃহস্থ জীবন? আমি কি কোনও ঘরে ঘুমোই না, চাল ডাল কিনি না, রাঁধি না, খাই না? ঘুমোই, রাঁধি, খাই। আমার ঘরে কি অতিথিরা আত্মীয়রা বেড়াতে আসে না? আসে। আতিথেয়তা পায় না? পায়। আপনি কি স্বামী সন্তান নিয়ে বসবাস করাকে গৃহস্থ জীবন বলেন? ওইসব ক্ষুদ্র সংজ্ঞা থেকে আমি অনেককাল মুক্ত। 


প্রশ্ন ১৫: তসলিমা নাসরিনকে একজন লেখক, একজন অ্যাকটিভিস্ট, একজন মানুষ হিসেবে কিভাবে দেখেন?

উত্তর: একজন সৎ মানুষ হিসেবে দেখি। একজন নিঃস্বার্থ,  হৃদয়বান মানুষ।  


প্রশ্ন ১৬: আপনি হিন্দি সাহিত্য জগতে এখন অনেকটাই পরিচিত। বাংলা এবং হিন্দি সাহিত্যকে কিভাবে তুলনা করবেন?

উত্তর: আমি যেহেতু বাঙালি,  বাংলা আমার ভাষা,    বাংলা সাহিত্য শৈশব থেকে পড়ছি,  সেহেতু বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান অন্য সব  সাহিত্য সম্পর্কে  আমার যা জ্ঞান, তার  তুলনায় অনেক বেশি।  হিন্দি সাহিত্য পড়তে গেলে অনুবাদ পড়তে হয়। পড়েছি,  যতটুকু পড়েছি, তাতে মুগ্ধ আমি। সব ভাষাতেই থাকে  উঁচুমান, মাঝারিমান, নিম্নমানের রচনা।   দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা হচ্ছে বলে সম্ভবত বাংলায় উঁচু মানের সাহিত্যের  পরিমাণটা বেশি।  
   

প্রশ্ন ১৭: হিন্দি পাঠকদের জন্য কী বক্তব্য দেবেন? 

উত্তর: আমি রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় গুরু  নই। ঘন ঘন বক্তব্য দেওয়ার বা ভাষণ দেওয়ার অভ্যেস নেই, উপদেশ বর্ষণও কম করি।  আমার যা বলার, তা আমি লিখি।   লেখকের কাজই তো লেখা।