Monday, 13 May 2013

অ্যালবাম২






মেলবোর্নের গ্লোবাল এথিস্ট কনভেনশনে (২০১০) বক্তৃতা করছি। দর্শকের সারিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। কয়েক হাজার দর্শক,    সকলেই টিকিট করে বক্তৃতা শুনতে এসেছেন।  অস্ট্রেলিয়ার নানা অঞ্চল থেকে, এবং  ইওরোপ/ আমেরিকা থেকে আসা শিক্ষিত সচেতন ধর্মমুক্ত, একই সঙ্গে  মানববাদী, নারীবাদী। এই মানুষগুলো আমাকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। এই মানুষগুলো আমার মতের সঙ্গে একশ' ভাগ একমত। এঁদের সঙ্গেই আমি নিরাপদ বোধ করি।  এঁদেরই আমি মনে মনে দেশ বলে বা স্বদেশ বলে ডাকি।





মেলবোর্নে আমাদের   কনভেনশন  শেষ হলে  অস্ট্রেলায়ান হোস্ট   তানিয়া স্মিথের  বাড়িতে সন্ধেয়  আমাদের পানাহারের নেমন্তন্ন ছিল।  যখন ওদের বাগানে ছবি তোলার ডাক পড়লো, আমাকে বলা হল  রিচার্ড ডকিন্স আর পিজি মায়ার্সের মাঝখানে বসতে। এর চেয়ে চমৎকার প্রস্তাব আর কী  আছে জগতে? আমাকে কেন বলা হয়েছিল পৃথিবী বিখ্যাত  দুই বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে বসতে, আমি কি   আদৌ তাঁদের ধারে কাছে আসার যোগ্যতা রাখি? সম্ভবত, সেদিন, মেলবোর্ন কনভেনশনে  আমি দর্শকদের স্ট্যান্ডিং অভেশন পেয়েছিলাম  বলে! আমি ছাড়া কোনও স্পিকার ওই  কনভেনশনে ঠিক ওরকম ব্যাপক স্ট্যান্ডিং অভেশন পাননি বলে! অস্ট্রেলিয়ার এথিস্ট কমিউনিটি আমাকে নিয়ে  রীতিমত উত্তেজিত। সকলের অনুরোধে এবং উৎসাহে আমি বসেছিলাম আমার দুই প্রিয় মানববাদী বিজ্ঞানীর মাঝখানে। 

 ছবি তোলা হল। আড্ডা হল। রিচার্ড ডকিন্স আর পিজি মায়ার্সের   সঙ্গে আরও অনেক অনুষ্ঠানে আমার দেখা হয়েছে। কিন্তু ওভাবে হৈ হৈ করে ছবি তোলা হয়নি মেলবোর্নের মতো। দু’জনের মাঝখানের আসনেও ওরকম আর বসা হয়নি।   ওয়াশিংটন ডিসির রিজন র‍্যালিতে কথা হল রিচার্ড ডকিন্সের সঙ্গে। তার আগের রাতে ডিনারেও।  রিজন র‍্যালিটা ছিল খুব বিশাল।  পঁচিশ হাজার মুক্তচিন্তার মানুষ  বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুনেছে আমাদের বক্তৃতা। তুমুল ঝড় বৃষ্টিও  ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মল থেকে কাউকে একচুল নড়াতে পারেনি। 



পিজি মায়ার্সের সঙ্গে এরপর নরওয়ের  হিউ্ম্যানিস্ট কনভেনশনে (২০১১) দেখা হল, আড্ডা হল। নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি আমাদের নোবেল মিউজিয়ামে ডিনার খাওয়ালো। ডিনারে আমার আর পিজির সামনে বসেছিলেন  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান। বুদ্ধিমান লোক, কিন্তু এই হিউম্যানিস্ট কনফারেন্সে তিনি কেন। প্রথমে অত পাত্তা দিইনি। কিন্তু ভদ্রলেকের সেন্স অব হিউমার আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছিল।  ভারতের উদ্বিগ্ন কর্তরা নাকি ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের লিস্টে ভারত অন্তত পাকিস্তানের ওপরে আছে কি না, ওপরে থাকলেই খুশি, দুনিয়ার আর সব দেশের নিচে থাকলেও ক্ষতি নেই, শুধু পাকিস্তানের নিচে না থাকাটাই  ভীষণ জরুরি।

 পিজির সঙ্গে     রিজন র‍্যালিতেও আড্ডা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আড্ডা হয়েছে জার্মানির কোলনে, ইওরোপিয়ান এথিস্ট কনভেনশনে (২০১২)।  কনভেনশনের আগের রাতে সেই যে জার্মানির বিখ্যাত বিয়ার পান শুরু হল, কনভেনশন শেষ হওয়াতক সেটি প্রধান খাদ্যরূপে চললো। আমি বিয়ারে অভ্যস্ত নই। কিন্তু ভালো সঙ্গী জুটলে তেতোবিষও নির্ভাবনায় গেলা যায়।



নিতান্তই খুব প্রয়োজনে কনফারেন্স রুমে গিয়েছি, বাকিটা সময় রুমের বাইরে খোলা বিয়ার বাগানে আড্ডা। আমি, পিজি, রেবেকা। মাঝে মাঝে কেউ কেউ  আড্ডায় ঢুকেছে, আড্ডা থেকে  বেরিয়েছে।

পিজি অসম্ভব বিয়ার ভালোবাসেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাও দিতে পারেন  আড্ডাবাজ বাঙালির মতো। রিচার্ড ডকিন্সের লেখা আমার ভালো লাগে। পিজি মায়ার্সের লেখাও। কিন্তু আড্ডা দিতে হল আমি রিচার্ড ডকিন্সকে নয়,  পিজিকেই বেছে নেব।


 রিচার্ড ডকিন্স সুদর্শন  ইংলিশ ভদ্রলোক, রেবেল। পিজিও রেবেল, তবে দেখতে যেমনই হোন না কেন, পিজির রসবোধ প্রচণ্ড। আড্ডায় এটিরই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। পিজি মানুষ হিসেবেও বেশ বড়। কেবল কি বড় আড্ডাবাজ হলেই চলে, বড় মানুষও হতে হয়।

Sunday, 12 May 2013

আগুন নিয়ে কবিতা

অনেকদিন কবিতা লিখি না। না লিখতে লিখতে জীবন যেন কেমন গদ্যময় হয়ে উঠছে। দু'দিন আগে আগুন নিয়ে একটা কবিতা লিখলাম।


অগ্নি  


ক.
কাল রাতে হঠাৎ আগুন লেগেছিল ঘরে।
অনেকদিনের ঠাণ্ডা শরীর,
তাপ-উত্তাপ ভুলে যাওয়া ঠাণ্ডা শীতল শরীর,
না-স্পর্শ না-ছোঁয়া ঠাণ্ডা শরীর,
ওই শরীর কাল স্পর্শ করেছিল আগুন।

স্পর্শকে আসকারা দিলে যা হয়, হাত পা ছড়াতে ছড়াতে বড় হতে থাকে।
বড় হতে হতে ঠোঁটের নাগাল পায়।
আগুনের লকলকে জিভ কী-করে-কী-করে যেন ঠোঁটের নাগাল পেয়েছিল কাল।
আগুন আমাকে চুমু খেয়েছিল কাল।
আগুন আমার চিবুকের বুকের পিঠের পেটের যৌনাঙ্গের উরুর
নাগাল পেয়েছিল  কাল।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে ঠোঁট,  কিন্তু পোড়েনি,
পুড়ে যেতে ইচ্ছে করেছে শরীর, কিন্তু পোড়েনি,
ছিটে ফোঁটা আগুন শেষঅবধি  কিছুই পোড়াতে পারেনি আমার।

পুড়ে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পুড়ে গেলে  ছাই হয়ে যাবো,   
কে চায় জেনে বুঝে ছাই হতে! কতই বা ছাই হতে পারে একা একা
একাকী নির্জন মানুষ!  

আগুনের সঙ্গে ও ছিল নিতান্তই  আমার শরীর শরীর   খেলা।
সামান্য একটু আগুন, মধ্য রাতের আগেই কী রকম দপ করে নিভে যায়,
হেরে যায়।
নিজেকে ঢুকিয়ে নিয়ে   নিজের  খোলসে,
আগুন চলে যায়, চারদিক অন্ধকার করে  চুপচাপ  বাড়ি চলে যায়।


খ.
এখনও জানি না ও আসলে আগুন ছিল নাকি  আগুনের আঁচ।
আগুন নয়, আগুন কি কখনও কাউকে না  পুড়িয়ে ছাড়ে!
সম্ভবত আগুনেরই আঁচ, আর ওকেই আগুন ভেবে মনে মনে পুড়তে চেয়েছি আমি!


কে জানে    আমারই আঁচ ছিল কি না,  আমার আগুনের!  
এক শরীর আগুন সেই কবে থেকে   মর্গে পড়ে আছে,
আমিই হয়তো একটু একটু করে ঘুম ভাঙিয়েছি,
আমিই হয়তো আমার  আগুন ছুঁইয়ে ওকে আগুন করতে চেয়েছি,
আমিই হয়তো চেয়েছি ও আমাকে পোড়াক,
কিন্তু কী করে পোড়াবে ও, আগুনের মতো দেখতে শুনতে বটে,
সত্যিকার আগুন তো নয়!


----------
প্রায় ন'বছর আগে আগুন নিয়ে আরও একটি কবিতা লিখেছিলাম! তখনও দেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ। কলকাতার দরজা সবে খুলেছে।  কবিতাটি হারভার্ডের  কেনেডি ইস্কুলে বসে লেখা।    এক শীতে বরফে ডুবে আছি, তখন। 

তুষারের ঝড়ে

হঠাৎ কে যেন আমাকে ছুঁড়ে দিল আমাকে তুষারের ঝড়ে, 
যতদূর চোখ যায়, যতদূর যায় না, চোখ ধাঁধানো সাদা, শুধু সাদা, শুধু সাঁ সাঁ
উদ্বাহু নৃত্য চলছে তুষার-কন্যার, শুকনো পাতার মতো আমাকে ওড়াচ্ছে। 
পাকে ফেলে খুলে নিচ্ছে গা ঢাকার সবক'টা কাপড়। 
আমার চুখ চোখ, 
আমার সব, 
আমার সর্বাঙ্গ ঢেকে গেছে তুষারে। 
আকাশ নেমে এসেছে একেবারে কাছে, ছুঁতে নিলেই 
জীবন্ত একটা ডাল খসে পড়লো, 
আকাশ এখন আর আকাশের মতো নয়, 
মুখ থুবড়ে সেও পড়েছে ঝড়ে। 
দু'একটি গাছ হয়তো ছিল কোথাও, ভেঙে ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে তুষার স্তূপে, 
প্রকৃতির কাফন আমাকে মুড়িয়ে নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে কোথাও, কোনও গর্তে। 
ঠোঁটদুটো কাঁপছে আমার, কান লাল হয়ে আছে, নাকে গালে রক্ত জমে আছে, 
হাতের আঙুলগুলো সাদা, হিম হয়ে থাকা সাদা, 
আঙুলগুলোকে আঙুল বলে বোধ হচ্ছে না, কয়েক লক্ষ সুঁই যেন বিঁধে আছে আঙুলে, 
আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না, কিছুকে দেখতে পাচ্ছি না, 
সব সাদা, মৃত্যুর মতো, নৈঃশব্দের মতো, চন্দ্রমল্লিকার মতো, 
একটু  একটু করে রক্তহীন হচ্ছে ত্বক, 
একটু একটু করে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতার্ত দাঁত আমাকে খেতে খেতে খেতে খেতে 
আমার পা থেকে হাত থেকে উরুর দিকে বাহুর দিকে হৃদপিণ্ডের দিকে উঠে আসছে, 
উঠে আসছে। 


আমি জমে যাচ্ছি
জমে যাচ্ছি আমি
গোটা আমিটি 
বরফের 
একটি 
পিণ্ড 
হয়ে 
যাচ্ছি....


ও দেশ, ও কলকাতা, একটু আগুন দিবি?