Sunday, 14 April 2013

পয়লা বৈশাখের উৎসব দুই বাংলায় একই দিনে হোক





পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে  বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের উৎসব বেশি ঘটা করে  হয়,   
 কিন্তু  উগ্রপন্থী বাঙালি মুসলমানরা  বাংলাদেশ থেকে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংস  করে দিয়ে আরবীয় সংস্কৃতি আমদানি করছে বলে  ভবিষ্যতে  আদৌ এই   ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি উৎসবটি বাংলাদেশে  পালন করা সম্ভব হবে কি না আমার সন্দেহ। এমনিতে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের তারিখ বদলে দিয়েছে এরশাদ সরকার। ১৪ই এপ্রিল তারিখটিতে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালন করার সরকারি আদেশ জারি   হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের   বাঙালি হিন্দুরা যা পালন করছে, তা থেকে যেন একটু বদল হলেই মুসলমানিত্বটা ভালো বজায় থাকে। কী আর বলবো, মূর্খতার কোনও কুল কিনারা নেই! পাকিস্তানি শাসকরা চাইতো বাঙালি হিন্দু আর
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে বিভেদ বাড়ুক। ওরা বিভেদ না বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশে ওদের যে অনুসারীদের ওরা রেখে গেছে, তারাই বিভেদ বাড়াচ্ছে এখন। তারাই  বাংলা  ক্যালেণ্ডারকে মুসলমানের ক্যালেণ্ডার বানিয়েছে। বাংলা ক্যালেণ্ডারের পেছনে মোগল সম্রাট আকবরের অবদান ছিল বলে আকবরের ধর্মের কিন্তু কোনও অবদান ছিল না। কেবল কৃষিকাজের, কেবল ফসলের, কেবল  খাজনা আদায়ের    হিসেব রাখতে হিজরি ক্যালেণ্ডারের বদলে বাংলা ক্যালেণ্ডার সুবিধে বলেই ওই ক্যালেণ্ডারের সূচনা  করা হয়েছিল।

আমার নানি চৈত্র সংক্রান্তিতে তেতো রাঁধতেন।  নানি রাঁধতেন, কারণ নানির মা রাঁধতেন। নানির মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা রাঁধতেন। নানির মা’র মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা’র মা রাঁধতেন। চৈত্র সংক্রান্তিতে আমার খালারা বা মামিরা কিন্তু এখন আর  তেতো খাবার রাঁধেন না, তেতো খাবার খানও  না। চৈত্র সংক্রান্তিতে    গ্রামে গ্রামে    চড়ক পুজো হত। আমার দাদারা বাঁশবন পার হয়ে চড়ক পুজো দেখতে যেতো।  ওখানে বাঁশ - দড়ির খেলা দেখতো হাঁ করে।  ওই দিনই  লোকনাথ পঞ্জিকা কিনতো সবাই। আমার দাদারাও।   বৈশাখের প্রথম দিনে   নানারকম   মাটির কাজ, বেতের কাজ, কাঠের কাজ, শোলার কাজের  মেলা বসতো।   পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে বৈশাখের উৎসব হত। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খিস্টান সব বাঙালিই বৈশাখের উৎসবে অংশ নিত। নানারকম খেলা প্রতিযোগিতা হত গ্রামে,  নৌকা বাইচ, কুস্তি, লাঠি খেলা, এসব।   
আমাদের মফস্বল শহরে আমরা ছোটরা  সকাল থেকে বাজাতাম বাঁশি-বেলুন। বিকেলে বিন্নি ধানের খই,  চিনির হাতি ঘোড়া, মাটির পুতুলের মেলায় যেতাম।   

সেই সবও কি আর আছে আগের মতো!  এখন শুনেছি যা হওয়ার শহরেই হয়, যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সেই শিল্পী সাহিত্যকদের দলটিই    ভোরবেলা গান গায়   রমনার অশ্বথ্ব তলায়।  সারা দিন গাইতে থাকে    জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক। রমনায় সংস্কৃতমনা, মুক্তমনা   বাঙালির ভিড় বাড়ে বৈশাখের ভোর থেকেই।  পান্তাভাত, কাঁচা লংকা, ইলিশ মাছ খাওয়ার ধুম পড়ে।
সুতি শাড়ি আর পাজামা পাঞ্জাবিতে ছেয়ে যায় রমনা।    ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট নামের  বিখ্যাত এক গানের দল    বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করছে রমনায়। পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচার সয়েছে। তার চেয়েও বেশী অত্যাচার সইছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুসলমান মৌলবাদিরা গ্রেনেড ছুঁড়েছে পয়লা বৈশাখে, ছায়নাটের গানের অনুষ্ঠানে। তারা পছন্দ করে না ইসলামি সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনও সংস্কৃতি। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি।    


পয়লা  বৈশাখে      ছায়ানট ছাড়াও উল্লেখযোগ্য উৎসব  ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে   সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘোরে।     রং-বেরঙের মুখোশ, বিশাল বিশাল  কাগজের বাঘ ভালুক হাতি ঘোড়া থাকে শিল্পীদের হাতে হাতে।   
ঢাক ঢোলক  বাজে। আটপৌড়ে শাড়ি, ধুতি পরে ছেলে মেয়েরা নাচে।  রাস্তা আগের রাতেই মুড়ে দেওয়া হয়  চমৎকার আল্পনায়। এই  বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দেখার জন্য   আজও ভীষণ ভিড়।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নিরাপদ জায়গাটুকুতেই।



শুনেছি সোনারগাঁয়ে  নাকি বউমেলা   হয়। সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো করতেই মূলত লোক আসে। 
মনের গোপন বাসনা পুরণের  আশায় নাকি মেয়েরাই বেশি আসে। পাঁঠাবলির রেওয়াজও নাকি আছে।   সোনারগাঁর কাছেই  আরেক অঞ্চলে  ঘোড়ামেলাও হয়। কোনও এক সময় কোনও এক লোক  নাকি    ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের দিনটিতে সবাইকে প্রসাদ খাওয়াতেন।  লোকটি  মারা যাওয়ার পর   তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে গাঁয়ের লোক।  প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ওই স্মৃতিস্তম্ভে    একটি   মাটির ঘোড়া রাখা হয়।  আর  ওটির আশেপাশেই  রীতিমত হৈ হৈ করে  মেলা বসে যায়।  এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ যারাই মেলায় আসে, সবাইকে  কলাপাতায়  খিচুড়ি  খাওয়ানো। এক দিনের এ মেলায় হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। এই ঘোড়ামেলায় শুনেছি   নাগরদোলা, পুতুল নাচ আর  সার্কাসও থাকে।    কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত।  এখন জানি না কীর্তন আগের মতো হয় কি না বা  এখনও  আদৌ ওই ঘোড়ামেলাটাই হয় কি না। আর হলেও জানিনা ঠিক  কতদিন হতে পারবে এসব মেলা। 

বাংলাদেশে দু যুগের বেশি হল বাঙালি সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে আরবীয় সংস্কৃতি
আনার যে কাজ  জীবন –মরণ  পণ করে চালাচ্ছে ধর্মান্ধ মূর্খরা,   তাতে তারা  অবিশ্বাস্য রকম সার্থক। একশয় একশ না পেলেও ষাট সত্তরের কাছাকাছি নম্বর জুটে যাচ্ছে।  ধর্মের রীতি টুকু বাদ দিলে, সব ধর্মের  বাঙালির আচার অনুষ্ঠান একই ছিল এতকাল। এখন শুনি বাঙালি মুসলমানরা নাকি ‘গায়ে হলুদ’ অনু্ষ্ঠানটিকে আর ‘গায়ে হলুদ’ বলে না। বলে, মেহেদি।   
মুসলমানি মেহেদি! হলুদ শাড়ির বদলে মেয়েরা  মেহেদি রঙের শাড়ি পরে গায়ে হলুদের দিনে। চিরকালের লাল বেনারসির বদলে   শাদা গাউন পরে শুনেছি বিয়ে  করছে কেউ কেউ। একটা অসাধারণ সংস্কৃতিকে, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে, নিজ পরিচয়কে   খৎনা করে দেওয়া হচ্ছে চোখের সামনে। আর খৎনা করার  হাজমগুলো, হাতে ছুরি নিয়ে   তাণ্ডব নৃত্য করছে। মুখ বুজে হাজমদের নাচ দেখছে সবাই। দেশ হাজমে গিজহিজ করছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো দেখেইনি  হালখাতা, গ্রামে গ্রামে পয়লা বৈশাখের মুড়ি মুড়কির, পিঠেপুলির  মেলা।



আমি বাংলাদেশের হাজমের নাচ বন্ধ করতে পারবো না। ও দেশ থেকে আজ কুড়ি বছর হল আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পয়লা বৈশাখের উৎসব আরও বর্ণাঢ্য করতেও আমি পারবো না।
ও রাজ্য থেকেও আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দু’ অঞ্চলেই মূর্খদের সংখ্যা প্রচুর। ওই মূর্খদের খুশি করতেই নাকি আমার উপস্থিতি বাংলায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূর্খরাই মূর্খদের খুশি রাখে। আমি আজ শুধু একটি আবেদনই করছি--   দুই বাংলায় দুটো ভিন্ন দিনে নয়, একই দিনে, একই তারিখে, পয়লা বৈশাখটা অন্তত করা হোক। বাঙলা ক্যালেণ্ডারের পয়লা বৈশাখ গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডারে কখনও তেরো, কখনও চৌদ্দ, কখনও পনেরো।  কিন্তু বাংলাদেশে চৌদ্দ তারিখকে পয়লা বৈশাখের জন্য শেকল দিয়ে  বেঁধে দেওয়া হয়েছে।      
ঈদ রোজাগুলোর তারিখ কিন্তু বাঁধা হয়নি।  হিজরি ক্যালেণ্ডার  অনুযায়ীই সেসব পালন করা হয়। তবে বুড়ো হাজম ডেকে বাংলা ক্যালেণ্ডারের  মুসলমানি করাটার দরকার কী ছিল! হিন্দু থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভিনদেশি  সংস্কৃতি আনা,   বাঙালি সংস্কৃতি বিলুপ্ত  করা, আরব না হয়েও জোর করে আরব হওয়ার চেষ্টা –এসবই  কি সত্যিকারের মুসলমান হওয়ার রাস্তা! নিজেদের  ঐতিহ্যের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে বরণ করায়  কোনও গৌরব নেই।    ওই আরব দেশে বসে কোনও এক কালে কোনও এক লোক ধর্ম রচনা করেছিল, যে ধর্মের তুমি অনুসারি  কারণ ওই অঞ্চলের কিছু লোক তোমার অঞ্চলে   তাদের ধর্মকথা শোনাতে ঢুকেছিল, হয় তোমার পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারী ওদের কথায় ও কাজে  মুগ্ধ হয়ে ভিনদেশি মরুভূমির ধর্ম বরণ করেছে,   নয় নিচু জাত বলে বা গরিব বলে তাদের নিজেদের ধর্মের কতিপয় দুষ্ট  লোক  দ্বারা উপেক্ষিত আর শোষিত   হতে হতে ধর্মান্তরিত হয়েছে।  আরব দেশেও   কিন্তু ‘ভিক্ষুক, মিসকিন’ বলে তোমাকে ঘেন্না ছিটোচ্ছে আরবরা। এই সেদিনও আট জন বাঙালি মুসলমানকে  জনসমক্ষে জবাই করলো।   কারা জবাই করলো মুসলমানদের? মুসলমানরা। যা তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি নয়, তাকেই তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি হিসেবে লুফে নিচ্ছ আজ। এমন নয় যে ভালোবেসে নিচ্ছ, ভয়ে নিচ্ছ, বিভ্রান্তিতে নিচ্ছ। আর পরিণত হচ্ছ নামহীন, ঠিকানাহীন, পরিচয়হীন একটা  ধর্মের পিণ্ডে।  ময়ুরপুচ্ছে কাকের লেজ লাগাচ্ছো মুসলমান হওয়ার জন্য। না, এই অসততা করে  তুখোড়  মুসলমান হয়তো  হওয়া যায়, ভালো মানুষ  হওয়া যায় না। 





দুই বাংলায় পয়লা বৈশাখের তারিখটা এক হলে অন্তত মনে হবে,   উৎসবটা  বাঙালির উৎসব।  দুই দেশের বাঙলা একাডেমীর কর্তারা   অন্তত পয়লা বৈশাখের উৎসবটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কথা বলুন।  অন্তত একদিনের জন্য হলেও না হন হিন্দু, না হন মুসলমান। অন্তত একদিনের জন্য একবার একটু বাঙালি হন। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এবং হাসিনা সরকার, শুনছেন? ক্যালেণ্ডারের কোনও ধর্ম নেই,  লিঙ্গ নেই। ধর্মহীন, লিঙ্গহীন ক্যালেণ্ডারকে কুপিয়ে মুসলমান বানিয়েছেন মনে করছেন, আসলে ও মুসলমান হয়নি। ও এখনও আগের সেই ধর্মহীন লিঙ্গহীন  বাংলা  ক্যালেণ্ডারই রয়ে গেছে। ক্যালেণ্ডারকে মানুন। আল্লাহ জানেন যে আপনারা বাঙালি, এ কোনও লজ্জার কথা নয়। আরবরাও জানে আপনারা বাঙালি, নকল আরব সাজার চেয়ে ভালো বাঙালি হন, এতে আরবদের  শ্রদ্ধা পাবেন। তা না হলে যে মিসকিন, সে চালচুলোহীন নাম পরিচয়হীন মিসকিনই জীবনভর রয়ে যাবেন।    
 


Saturday, 13 April 2013

অ্যালবাম ১





কী যেন হয়েছিল আমার একটা সময়।  কেউ একজন বলেছিল, অথবা কোথাও পড়েছিলাম, ‘ক্যামেরা ট্যামেরা ফালতু জিনিস। সবচেয়ে বড় ক্যামেরা হল মনের ক্যামেরা। সেটি দিয়ে যা দেখা যায়, তা-ই চিরকাল রয়ে যায়। মাথাটা হল অ্যালবাম। কিছুই হারাবে না, নষ্ট হবে না। আর কাগজের ছবি, ও তো ছিঁড়ে যায়। হারিয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায়’। আমি সাধারণত সহজে প্রভাবিত  হই না অন্যের কথায়। নিজে ভেবে, যুক্তি দিয়ে যতক্ষণ না তা প্রমাণ করছি, অথবা আমার মন মানছে আমার এখনও ভাবলে অবাক লাগে   আমি অত সহজে মেনে নিয়েছিলাম যে ক্যামেরা বড় খারাপ জিনিস, ওই একটা ছোট্ট মেশিনের চেয়ে আমি আমার মস্তিস্ককে বেশি বিশ্বাস করি। আই সত্যি সত্যি ছবি তোলা বন্ধ করে দিয়েছিলামবিশেষ করে সেই সময় যখন আমি মাসে কুড়ি দিনই বিভিন্ন দেশে ঘুরছি, বিভিন্ন মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছি, বা কবিতা পড়ছি, বা  বিখ্যাত সব ঐতিহাসিক এলাকা দেখছি,   লেখক সাহিত্যক,  রাজনীতিক, নারীবাদী, মানববাদীর   সঙ্গে  আলোচনা করছি। ওই বৈচিত্রময় ব্যস্ত জীবনের বেশির ভাগ  স্মৃতিই এখন আর নেই।

বেশ অনেক গুলো বছর পার হওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি,   মাথাকে বিশ্বাস করা আমার উচিত হয়নি। এ হয়তো এখনকার অংক এখন কষে দিতে পারে, কিন্তু আর্কাইভ  হিসেবে এক  ফোঁটা একে বিশ্বাস করা যায় না। স্মৃতি এই কিছুদিন আছে, তারপরই হারিয়ে যায় ফুড়ুৎ করে সেই ছোটবেলার চড়ুই পাখির মতো। শৈশব কৈশোরে অনেক কিছু চমৎকার মনে থাকে। কিন্তু বয়স যত বাড়ে, তত যে স্মৃতি ঝাপসা হতে থাকে, তা ডাক্তার হয়ে জানা  উচিত ছিল আমার। আসলে ওই জ্ঞানটাও মাথা থেকে উবে গিয়েছিল। তা না হলে ক্যামেরাকে কেন আমি গুডবাই বলবো!

একসময় লক্ষ করলাম আমি আর কিছুই মনে করতে পারছি না, কার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো, কী কথা হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য কী কী ঘটেছিল, কী কী দেখেছিলাম, কোথায় কোথায় গিয়েছিলাম। স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেল। আর যে ছবিগুলো কোনও না কোনও কারণে আমার কাছে আছে, সেসব স্মৃতি দুপুরের আলোর মতো জ্বলজ্বলে। একটা ছবি কত কিছুই না  মনে করিয়ে দেয়। ছবি হল জীবন্ত ডায়রি। কিছু ছবি ছিল বলে  আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে অনেক ঘটনার কথা মনে পড়েছে। ওই ছবিগুলো না থাকলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই যেমন হারিয়ে গিয়েছিল স্মৃতির কুঠুরি থেকে, তেমন হারিয়ে যেত আমার জীবনের ইতিহাস থেকে।   আত্মজীবনী লেখার সময় ছবির মূল্য আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। 





আমাদের বাড়িতে প্রথম ক্যামেরা এনেছিল আমার বড়দা, যাকে দাদা বলে ডাকি।  সেই ছোটবেলায় দাদাকে দেখতাম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলতো। তারপর আরও একটু বড় হয়ে   চিত্ররূপা স্টুডিওতে   ক’দিন পর পরই ছবি তুলতে যেত।  সেই সব পোজ দেওয়া ছবিগুলো  আবার  বড় বড় ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতো।  পাঞ্জাবি পাজামা, কাঁধে শাল, হাতে শেষের কবিতা। দাদার চেহারাটা  বেশ নায়ক নায়ক ছিল।   মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে যেত ছবি তুলতে। একবার বাবা আমাকে তার গাঁয়ের বাড়িতে নিয়ে গেল  দাদি মারা যাওয়ার পর। ওই আমার প্রথম যাওয়া বাবার গাঁয়ের বাড়ি। ও-ই শেষ।   কত যে ছবি তুলেছিলাম বাবার। সব আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে, বাবার বাবা বেঁচে ছিল তখন, তার সঙ্গে। দাদির কবরের সামনে। বাবার শৈশবের সেই ঘর দুয়ার, সেই মাঠ, সেই খেত খামারের সঙ্গে।      যেসবের গল্প শুনেছিলাম অনেক,   দেখিনি আগে, সেসবের ছবি। ছবিগুলো বেশ ছিল।  তবে আমাদের ময়নসিংহের পুরোনো বাড়িটা  একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা স্যাঁতসেঁতে ছিল বলে, নাকি ব্রহ্মপুত্রের লোনা হাওয়ার কারণে, জানি না,   ছবি খুব নষ্ট হতে যেত। নষ্ট হওয়া শুরু হলে   রোদে দেওয়া হত  ছবি। জানি না রোদ    ছবির আদৌ কোনও উপকার করতো কি না। একবার বাইরের সিঁড়িতে বাবার  এক-অ্যালবাম-ছবি রোদে দিয়েছিলাম। পরে আর  অ্যালবামটা পাইনি।  এখনও মনে পড়ে  রোদের সিঁড়ি থেকে হারিয়ে   যাওয়া ছবিগুলোর কথা। কষ্ট হয়।  
 

ভাবছি  অ্যালবাম নামে মাঝে মাঝে একটা সিরিজ ব্লগ লিখবো, যেখানে পুরোনো ছবি নিয়ে, তার পেছনের কাহিনী নিয়ে কথা বলবো। আমার, আমার বন্ধুদের, আত্মীয়দের, চেনা পরিচিতদের, অচেনাদের ছবি।   বিরাট , বিশাল কোনও কাহিনী নয়, একেবারে সাদামাটা কিছুও হতে পারে।  হাঁটছিলাম, জায়গাটা ভালো লাগলো, ছবি তুললাম। এরকম। আগে থেকে কোনও প্ল্যান করে নয়। যে ছবি হাতের কাছে পাই, সে ছবি নিয়েই।

শুধু কি ক্যামেরা না ব্যবহার করার জন্য ছবির স্বল্পতা আমার কাছে? এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক শহর থেকে আরেক শহর করতে হচ্ছে আমাকে আজ দীর্ঘ পঁচিশ বছর। দেশে দেশে   দৌড়োতে হচ্ছে আমায়, বেশির ভাগ দৌড়েনোই অন্যের ইচ্ছেয়, বা নিরূপায় হয়ে। এই করে করে হারিয়ে গেছে শত শত ছবি, শত শত স্মৃতি। যেটুকু অবশিষ্ট পড়ে আছে, তা-ই না হয় স্মরণ করবো। নতুন হোক, পুরোনো হোক। নতুন বলতে সত্যি কি কিছু আছে? এই তো একটু আগে যা নতুন ছিল,  এখনই তা  পুরোনো হয়ে গেছে। আমরা খুব দ্রুত এগোচ্ছি আমাদের  শেষ দেয়ালের দিকে। 




তখনও দেশের অবস্থা অত ভয়ংকর হয়নি। তখনও আমার পক্ষে মিছিল হতে পারতো ঢাকার রাস্তায়। কিছু ছেলেমেয়ে আমার পক্ষে পথে নেমেছিল। গার্মেন্টসএর মেয়েরাই ছিল বেশি। ব্যানার ধরে আছেন বিখ্যাত ভাস্কর শামীম শিকদার। সম্ভবত ১৯৯৩র শেষ দিকে বা  ১৯৯৪র প্রথম দিকে।   


আমি অজ্ঞাতবাসে, লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী আমার ফাঁসির দাবিতে  মিছিল মিটিং করছে। ঘোষণা করেছে, আমাকে   ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়িতে খোঁজা হবে, এবং পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলা হবে, শুধু আমাকে নয়, আমাকে যারা আশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও। ইসলামকে বাঁচাতে হলে এ ছাড়া আর   পথ নেই। জুলাই, ১৯৯৪ 



অজ্ঞাতবাসে একদিনই দেখা হয়েছিল আত্মীয়দের সঙ্গে। গোপন ঠিকানায় গোপনে মধ্যরাতে এসেছিল বাবা আর ছোটদা। ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল সেদিনই গোপনে। কদিন পর পরই বদলে যেত অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা। কেউ জানতো না আমি কবে কোথায় কার বাড়ির কোন বন্ধ ঘরে লুকিয়ে আছি। অজ্ঞাতবাসের এই ঘরটিতে বসে তেলরঙে কিছু ছবি এঁকেছিলাম। একটি ছবিতে আমি নিজে, আমাকে ঘিরে আছে টুপি পরা কতগুলো সাপ। বাবা আম খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। তখন কি আর কিছু খেতে ইচ্ছে করে! মৃত্যু বসে থাকে পাশে সারাদিন, শিয়রের কাছে সারারাত। জুন বা জুলাই ১৯৯৪






দু’মাস অজ্ঞাতবাসের পর ঘরে ফিরেছি। দু’মাস মা কেঁদে  কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।  মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মা। পাশে আত্মীয় স্বজন, মিলন (ছোটবোনের স্বামী), সুহৃদ (ছোটদার ছেলে), ছোটদা।  ৩ আগস্ট, ১৯৯৪




শান্তিনগরের ফ্ল্যাটে আমার স্টাডিতে। বড়দা, ছোটদা, গীতা বৌদি, সুহৃদ সঙ্গে। আমি তখন ভুলেও ভাবিনি আমার শখের ঘরদোর ছেড়ে   চিরকালের মতো আমাকে নির্বাসন জীবন যাপন করতে  হবে। ৩ আগস্ট, ১৯৯৪    


    ১৯৯৪ সাল, আগস্ট রাত। দীর্ঘ দু'মাসের অজ্ঞাতবাস শেষে ঘরে  ফিরেছি, হাই কোর্ট থেকে জামিন নিয়েধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছি এই অভিযোগ করে সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিল।  গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। অজ্ঞাতবাসে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না আমার। ধর্মীয় অনুভূতি খুব বাজে অনুভূতি। কয়েদি, পুলিশ, রক্ষী হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে। ল'ইয়ারের পরামর্শেই অজ্ঞাতবাসে যাওয়া। দু'মাস পর  জামিন নাকি দিয়েছিল এই গোপন শর্তে যে আমাকে দেশ ছাড়তে হবে।  সে রাতে   আমার শান্তিনগরের ফ্ল্যাটে  আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন  দেশের প্রখ্যাত ক’জন কবি,  বুদ্ধিজীবী। অজ্ঞাতবাসে ওঁরা  আমাকে বাঁচিয়েও রেখেছিলেন। খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, রুবী রহমান আর তাঁর  স্বামী নূরুল ইসলাম। নিচে কার্পেটে আমি, আমার পাশে আমার ছোটদা। কী নিয়ে কথা হচ্ছিল? নিশ্চয়ই তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা। মৌলবাদীদের আসকারা দিয়ে দেশের কত বড় সর্বনাশ খালেদা জিয়া    করছে। সারাদেশ জুড়ে মুসলিম মৌলবাদীরা আমার ফাঁসির দাবিতে তাণ্ডব  করেছে, মানুষ মারছে,  বেআইনি ভাবে আমার মাথার দাম ঘোষণা করছে, খালেদা জিয়ার সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং কালসাপগুলোকে দুধ কলা দিয়ে পুষছে।   দু'দিন পর আমাকে চলে যেতে হয়েছিল দেশ ছেড়ে। আমার দেশটায়  আামাকে আর ফিরতে দেয়নি কোনও সরকারই। কালসাপগুলো এখন আরও বড়। আরও বিষাক্ত।