Wednesday, 30 January 2013

কলকাতা শাসন করছে মৌলবাদীরা!






রুশদিকে কলকাতায় আসতে দেওয়া হবে না। খবরটি যখন শুনলাম, সত্যি বলতে কি, আমি অবাক হইনি। অবাক হবো কেন, আমাকেও তো আসতে দেওয়া হয় না, শুধু কলকাতায় নয়,  পুরো পশ্চিমবঙ্গেই আমার পা রাখা নিষেধ। সেই যে ২০০৭ সালে আমাকে তাড়ানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, আজও আমি নিষিদ্ধ সেই রাজ্যে। শুধু আমার উপস্থিতিই  নয়, আমার বইয়ের উপস্থিতিও নিষিদ্ধগত বছর কলকাতা বইমেলায় আমার বই ‘নির্বাসন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান   বাতিল করে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। যে মানুষের বাক স্বাধীনতার ওপর পঁচিশ বছর ধরে হামলা হচ্ছে,   দূর্বিষহ নির্বাসন-জীবন  যাপন করতে যে বাধ্য   হচ্ছে, বাংলায় লিখেও বাংলায় যার ঠাঁই নেই,  সাত-আটটি মাথার-দাম যার মাথার ওপর, শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে যাকে, সে কেন এক লেখককে কলকাতার সাহিত্যক-বৈঠকে উপস্থিত হতে বাধা দেওয়ায় চমকে উঠবে!

অবাক হইনি, কিন্তু   রুশদিকে কলকাতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া তীব্র প্রতিবাদ করছি প্রতিবাদ করেছি মকবুল ফিদা হুসেন,   এ কে রামানুজন, জেমস লেইন, রহিন্তন মিস্ত্রি, কমল হাসান-এর মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যখন আঘাত এসেছে। যখনই ধর্মীয় মৌলবাদীরা কোনও কিছুর দাবি করে, সে দাবি যতই অন্যায় দাবি হোক, সরকারের মধ্যে তা-ই মেনে নেওয়ার একটা প্রবল প্রবণতা লক্ষ করেছি। অনেক সময় মৌলবাদীরা অখুশি হতে পারে বা ঝামেলা পাকাতে পারে এই ভয়ে আগ বাড়িয়ে সরকার-পক্ষ থেকে অনেক অযৌক্তিক এবং অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়। আমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৩ সালে ‘যদি কিছু হয়’ ভয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন।  রুশদিকে কলকাতায় আসতে বাধা দেওয়ার পেছনে সরকারের ওই  যদি কিছুর ভয়ই কাজ করেছে।

কিন্তু এসব আর কতদিন? আর কতদিন মৌলবাদীদের, বিশেষ করে মুসলিম মৌলবাদীদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে সরকার, আর কতদিন ওদের অন্যায় আবদার মাথা নত করে মেনে নেবে? ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, ভারত   বাংলাদেশও নয়, পাকিস্তানও নয়, ওসব দেশের   নড়বড়ে নাম কা ওয়াস্তে গণতন্ত্রের মত  ভারতের গণতন্ত্র নয়।    ভারত শিল্পে, শক্তিতে, শিক্ষায়, স্থিতিতে আজ উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভারত কেন নিজেকে   মুসলিম মৌলবাদীদের  স্বর্গরাজ্য  হতে দিচ্ছে! হাতে গোণা কিছু মুসলিম মৌলবাদীকে খুশি করার জন্য অথবা ওদের ভয়ে আজ ভারতের  সংবিধানকে (১৯ক ধারা) অপমান করতে দ্বিধা করছেন না, দেশকে হাজার বছর পেছনে ঠেলে  দিতে    আপত্তি করছেন না  নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।  এর ফলে গোটা মুসলিম সম্প্রদায়, আর গোটা ইসলামই যে অসহিষ্ঞু বলে প্রমাণিত হয়ে গেল, তার দায় কে নেবে!  কেবল নির্বাচনে জেতার হিসেব!  দেশ গোল্লায় যাক, দেশের ভবিষ্যৎ গোল্লায় যাক, আমার নির্বাচনে জেতা চাই। প্রগতিবিরোধী, নারীবিরোধী, অর্বাচিন, অগণতান্ত্রিক, অশিক্ষিত, অসুস্থ, অসভ্য  মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিয়ে যারা আজ  সভ্য শিক্ষিত প্রগতিশীল শিল্পী সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতা হরণ করছে, মৌলবাদীদের শক্তি এবং সাহস বাড়াচ্ছে, তারা দেশের এবং দশের শত্রু, এ কথা আমি বলতে পারি, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বলতে পারি।    



Friday, 18 January 2013

বেড়ালের সঙ্গে আত্মীয়তা




*
যেভাবে বন্ধু গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে,  আত্মীয় সেভাবে ওঠে না গড়ে।
কাউকে  বেছে নিইনি কাকে আমি আত্মীয় চাই।   
জন্মের পর চোখ খুলে দেখি ভিড়, আত্মীয়দের ভিড়।
আত্মীয় অনেকে জন্মও নিল চোখের সামনে। আমি চাই বা না চাই, নিল।
ভালো বাসি বা না বাসি, তারা আত্মীয়।

খুব দুঃসময় আমার।
আত্মীয়রা এক এক করে ছেড়ে গেছে
ঘনিষ্ঠতা ছিল তারাও বছরের পর বছর গেছে,
একটু একটু করে ভুলতে ভুলতে পুরোটা ভুলেই গেছে, চলে গেছে,
যেদিকে গেলে ভালো হয় সেদিকে।

এর মধ্যে এক বেড়ালের সঙ্গে জানাশোনা হতে হতে,
দুপুরের রোদ পড়া উদাস বারান্দায় বসে, বিকেলগুলো খেলে, গুটিশুটি রাতে দুজন,
এভাবে জীবন কাটাতে কাটাতে   ধীরে ধীরে  আত্মীয়তা গড়ে উঠছে,
বেড়ালও সে কথা জানে।

যত আত্মীয় আছে আমার, এসে এক পাশে দাঁড়াক,
বেড়াল দাঁড়াক আরেক পাশে,
আমি বেড়ালের দিকেই যাবো।
যত বন্ধু আছে, তারাও দাঁড়াক,
আমি তবু বেড়ালের দিকেই যাবো।
বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, চাইলেই আত্মীয়তা হয় না।
বেড়ালের সঙ্গে সব হয়।

আত্মীয় হিসেবে মানুষের চেয়ে বেড়াল ভালো।
মানুষ যে কোনও সময় লুটপাট করে চলে যাবে, বেড়াল যাবে না,
আঙিনায় বসে অপেক্ষা করবে,
যতক্ষণ না ফিরি করবে,
চোখ বেঁধে নদীর ওইপর ফেলে দিয়ে আসি,
পখ খুঁজে খুঁজে, গায়ের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে, ফিরে আসবে।

বেড়ালরাও যায়, যেতে জানে।
তবে একবার আত্মীয়তা হয়ে গেলে
আত্মীয়দের মতো আর নিষ্ঠুরতা করে না।

পাড়া ঘুরে বলেও বেড়ায় না যে ভালোবাসে,


কিন্তু বাসে,  ভীষণ বাসে, বেড়ালের মতো লুকিয়ে চুরিয়ে ভালোবাসে। 
পা টিপে টিপে, কেউ যেন না দেখে, বেড়ালের মতো আসে সে.
ভালোবেসে আসে। কাছে।
 


*

*

বেড়ালের আর কিছু চাই না, শুধু নিশ্চিন্তি হলেই হয়।
দুবেলা খাবার আর ধারে কোথাও পানীয় জল,
নির্ভাবনায় ঘুমোবার ঘরের কোণ বা বিছানা,
প্রাকৃতিক কাজে কর্মে কোনও এক আড়াল,
শত্রুর যাতায়াত নেই, উৎপাতহীন একটি শান্ত শিষ্ট বাড়ি।
শীতে ওম, আর গরমে ঠাণ্ডা হাওয়া।
নিশ্চিন্তের জীবন।
নিশ্চিন্তি কে না চায়!


আমিও তো চাই, তুমিও।
সবাই আমরা যার যার মতো এক একটা বেড়াল।
সবাই আমরা গোপনে গোপনে বেড়াল।
মানুষের মতো দেখতে ছোট বড় বেড়াল। 


*

একা থাকতে থাকতে বদঅভ্যেস হয়ে গেছে
মানুষের ভিড় থেকে নিজেকে আলগোছে সরিয়ে একাই থাকি।
বেড়াল পুষতে পুষতে এখন বেড়াল দেখলেই পুষতে ইচ্ছে করে।

একা থাকা মেয়েরা  নাকি বেশ বেড়াল পোষে,
শুনেছি ওদের ঘরে সাদা বা কালো বা ছাই বা সোনালি রংএর বেড়াল
দুএকটা থাকেই,  গায়ে না চড়লেও, আহলাদ না করলেও,
থাকে ঘরের কোণে বা উঠোনে কোথাও,থাকে।
মেয়েরা নাকি হোঁচট খেতে খেতে, জলে বা কাদায় ডুবতে ডুবতে,
এখানে সেখানে পুড়তে পুড়তে এইটুকু জেনেছে,
পুরুষ পোষার চেয়েও বেড়াল পোষা ভালো।

আমারও কি বছরের পর বছর পুরুষ পুষতে পুষতে  মনে হয়নি কালসাপ পুষছি আসলে!

এত প্রাণী জগতে, পুষতে যদি হয়ই পুরুষ কেন! 
কথা শোনে, বোঝে, চোখে ভাষাও আছে,  কাছে আসে, ভালোবাসে, পাশে শোয়,
আচঁড়ায় না, কামড়ও বসায়না আচমকা,
রক্তাক্ত করে না, এমন কিছুকে দিব্যি পোষা যায়, নির্ভাবনায়।